গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ল ১৬.৬৮%

প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা (ইউনিট) বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। আর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রতি ইউনিটে গড়ে দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এবার লাইফলাইন গ্রাহকের (০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী) বিদ্যুতের দামও বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সঞ্চালন (ট্রান্সমিশন) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে যখন দেশে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। এবার বিদ্যুতেরও মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি-শিল্প খাতের উৎপাদন ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, দেশের বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত সংস্কার বিশেষ করে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মতো বিষয় সংস্কার না করে উল্টো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপিয়ে দেয়া হলো। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও তাতে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক লোকসান কমাতে পারেনি। কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন না করে এ খাতের লোকসান কমাতে বিভিন্ন সময় বার বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন সরকারও সে পথে হাঁটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং জ্বালানি খাতে সংকটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় গত দেড় দশকের বেশি সময় বিপুল পরিমাণ দায়দেনা করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। দরপত্র ছাড়া এককভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং গ্যাস অনুসন্ধান না করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়ানোয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সে আমলে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে ট্যারিফ নেগোসিয়েশন, অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল, ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং এ খাতে দুর্নীতি, আমদানিনির্ভরতার বিষয়ে তারা কিছুই করতে পারেনি।

গত মাসে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানিতে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, ভোক্তা অধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে খাতসংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ খাতের সংস্কারের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং কমানোর জন্য জোর দাবি জানান বিইআরসির প্রতি।

দেশে গ্রাহক পর্যায়ে ও পাইকারি বিদ্যুতের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ফলে দেশে দুই বছর চার মাসের মাথায় আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়াল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। এতে বলা হয়, বিভিন্ন ধাপের (স্লাব) গ্রাহকদের মধ্যে সবচেয়ে কম ১৫ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে এবার। নতুন এ দাম জুন থেকেই কার্যকর হচ্ছে।

বিদ্যুতের নতুন দর অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট লাইফলাইন গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে। এ শ্রেণীর গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষকে সুলভমূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে লাইফলাইন গ্রাহক নামকরণ করা হয়। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ প্রথায় প্রথম ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের লাইফলাইন গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত ১৬ বছরে লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। ২০১০ সালের ১ মার্চ লাইফলাইন গ্রাহকরা প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য ২ টাকা ৫০ পয়সা করে দিতেন। তবে ২০২৬ সালের জুনে এসে তাদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ৩২ পয়সা করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।

শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে। এ শ্রেণীর গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর দাম ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ১০ পয়সা করা হয়েছে। ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারী বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ টাকা ১ পয়সা, ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সেচ পাম্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৪ পয়সা, ক্ষুদ্র শিল্পে (ফ্ল্যাট) প্রতি ইউনিটে ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৫ পয়সা (১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি) করা হয়েছে। রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা (১৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ বৃদ্ধি) করা হয়েছে। আর ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা (১৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ বৃদ্ধি) করা হয়েছে।

বিদ্যুতের পাইকারি (বাল্ক) মূল্যবৃদ্ধির পর বিদ্যুৎ খাতে বিপিডিবির বাড়তি আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ আয়ের পরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটির ঘাটতি হতে পারে ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিয়ে সমন্বয় করতে হবে। চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

পূর্বের খবরঅবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন আইভী
পরবর্তি খবরঢাকাসহ ৩৫ জেলায় তাপপ্রবাহ
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!