বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : কানাডাজুড়ে ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে বর্তমানে ৮৫৭টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে শুধু বৃহস্পতিবারই নতুন করে ২৩টি আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। দাবানলের ঘন ধোঁয়া সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে মিশিগান, মিনেসোটা, গ্রেট লেকস অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বায়ুদূষণ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতির কারণে লাখো মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
কানাডিয়ান ইন্টারএজেন্সি ফরেস্ট ফায়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জ্বলতে থাকা দাবানলের অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে অন্টারিও প্রদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক বড় দাবানল ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এসব আগুন থেকে উৎপন্ন ঘন ধোঁয়া থান্ডার বে ও টরন্টোর আকাশ ঢেকে ফেলেছে। একই সঙ্গে ধোঁয়ার একটি অংশ গ্রেট লেকস অতিক্রম করে নিউইয়র্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে শহরজুড়ে ধূসর-কমলা আকাশ, ঝাপসা দৃশ্যমানতা এবং লালচে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতো অস্বাভাবিক আবহ দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (এনওএএ) জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম দিকের বাতাসের কারণে এই ধোঁয়া সপ্তাহজুড়ে এবং সপ্তাহান্ত পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলে প্রবাহিত হতে পারে। এতে মিশিগান ও মিনেসোটার অনেক এলাকায় বায়ুর মান ‘হ্যাজার্ডাস’ বা অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী সুইস প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট। এর পরেই রয়েছে মিনিয়াপোলিস এবং কানাডার টরন্টো। দাবানলের ধোঁয়ার কারণে এই শহরগুলোতে বাতাসের মান দ্রুত অবনতি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, অন্টারিওতে আগামী কয়েক দিনে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তা দাবানল নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না। তবে আগামী সোমবার থেকে বাতাসের দিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ধোঁয়ার বড় অংশ কুইবেকের দিকে সরে যেতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বায়ুর মান কিছুটা উন্নত হতে পারে।
তবে এর আগে পর্যন্ত ধোঁয়া নিউ জার্সি পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রোববার সেখানে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত ম্যাচ আয়োজন নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি, তবুও বায়ুর মান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে টানা তৃতীয় বছরের মতো দাবানলের ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের চারজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা কানাডার দাবানল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, “আরেকটি বছর কেটে গেল, দাবানলের মৌসুম আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এবার আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে এসেছে।”
অন্যদিকে কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোকস্ট্রা তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, দাবানল কোনো সীমান্ত মানে না। এই সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যেভাবে একসঙ্গে কাজ করছে, সেই সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
দাবানলের কারণে উত্তর অন্টারিওর কয়েকটি আদিবাসী ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায়ের শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক পরিবার নৌকায় করে দুর্গম এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, আগুনে বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্টারিওতে একটি মালবাহী ট্রেন চারদিক থেকে দাবানলের আগুনে ঘিরে পড়েছে। পরে জরুরি উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে ট্রেনের সব কর্মীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেলওয়ে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সাময়িকভাবে রেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উত্তর আমেরিকায় দাবানলের মৌসুম ক্রমেই দীর্ঘ ও তীব্র হচ্ছে। ফলে শুধু কানাডাই নয়, সীমান্তবর্তী যুক্তরাষ্ট্রও প্রতি বছর ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের বড় ধরনের প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। এবারের পরিস্থিতিও সেই উদ্বেগকেই আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
-bbc




