আদিত্য সুমন
বিশেষ প্রতিবেদস
ভিনিউজ : বাংলার লোকঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু উৎসব রয়েছে, যা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের সম্মিলিত জীবনবোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঢাকার ধামরাইয়ের শ্রীশ্রী যশোমাধব দেবের রথযাত্রা তেমনই একটি ঐতিহ্য। প্রায় ছয় শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই উৎসব শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য মানুষ এই রথ টেনেছেন, মেলায় মিলিত হয়েছেন, আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন। যুদ্ধ, অগ্নিসংযোগ, রাজনৈতিক পালাবদল কিংবা সময়ের নির্মম পরিবর্তন- কোনো কিছুই এই ঐতিহ্যকে থামাতে পারেনি।
এ বছরও সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই শুরু হয়েছে ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা। যশোমাধব, কানাই-বলাই ও আদ্যা দেবীর বিগ্রহ সুসজ্জিত রথে আরোহন করে রথখোলা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত শোভাযাত্রায় অংশ নেন হাজারো ভক্ত। আগামী ২৪ জুলাই উল্টোরথের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। তবে রথযাত্রাকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক মাসব্যাপী ঐতিহ্যবাহী রথমেলা, যেখানে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন দেশের নানা প্রান্তের মানুষ।
ধামরাইয়ের রথযাত্রার উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা ও লোককথা রয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, স্থানীয় জমিদার শ্রী যশোপাল একদিন একটি ঢিবি খনন করে প্রাচীন মন্দির ও বিষ্ণুর রূপ শ্রীশ্রী মাধব দেবের বিগ্রহ উদ্ধার করেন। সেই রাতেই তিনি স্বপ্নাদেশ পান এবং নিজের নামের সঙ্গে ‘মাধব’ যুক্ত করে ‘যশোমাধব’ নাম গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই যশোমাধবের পূজা ও রথযাত্রার সূচনা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগের শেষভাগ থেকেই ধামরাই এই রথযাত্রার জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে রায় মৌলিক পরিবার, বালিয়াটির জমিদার এবং স্থানীয় হিন্দু সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় রথযাত্রা ক্রমেই বৃহৎ আকার ধারণ করে। বাংলা ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ সালের মধ্যে এখানে পর্যায়ক্রমে চারটি বিশাল রথ নির্মিত হয়। ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে নির্মিত প্রায় ৬০ ফুট উঁচু ত্রিতল রথটি ছিল বাংলার কাঠশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিঙ্গাইরের দক্ষ কারিগররা এক বছর ধরে পরিশ্রম করে এই রথ নির্মাণ করেছিলেন। প্রবীণদের স্মৃতিচারণ এবং ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়, একসময় ধামরাইয়ের রথের বিশালত্ব ও কারুকাজ এতটাই খ্যাতি অর্জন করেছিল যে অনেকে একে পুরীর জগন্নাথদেবের রথের চেয়েও বৃহৎ বলে বর্ণনা করেছেন।এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণ সীমিত, তবুও লোকঐতিহ্যে এই বিশ্বাস আজও গভীরভাবে প্রচলিত। বৃটিশ আমলে ভারত উপ মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধামরাই রথ উৎসবে যোগ দিতে ভক্তরা ।
ধামরাইয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে ১৯৭১ সালে। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই ঐতিহাসিক রথে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশাল কাঠের রথটি প্রায় সাত দিন ধরে জ্বলেছিল। আগুনে পুড়ে যায় শত শত বছরের শিল্পকর্ম, দুর্লভ কাঠখোদাই এবং বাংলার লোকঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। এটি ছিল কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনার ওপর হামলা নয়; বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার অপচেষ্টা।
কিন্তু ইতিহাসের চাকা থেমে থাকেনি। স্বাধীনতার পর দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার কুমুদিনী ট্রাস্ট নতুন রথ নির্মাণে এগিয়ে আসে। পরবর্তীকালে ভারতীয় হাইকমিশনের সহযোগিতা এবং স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নতুন রথ নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়। ২০১০ সালে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বর্তমান রথটি পুরোনো রথের ঐতিহ্য ও নান্দনিকতাকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ৪০ জন শিল্পী ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে রথটি নির্মাণ করেন। ৩৭ ফুট উচ্চতা, ২০ ফুট প্রস্থ, ১৫টি লোহার চাকা, কাঠের তৈরি ঘোড়া, সারথি এবং বিভিন্ন স্তরে দেব-দেবীর সূক্ষ্ম খোদাই-সব মিলিয়ে এটি আজও বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কাঠের রথ।
রথযাত্রাকে ঘিরে বসা মাসব্যাপী মেলা ধামরাইয়ের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণ। একসময় এই মেলায় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসত বিখ্যাত সার্কাস দল, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, মৃত্যুকূপ, যাত্রাপালা এবং বেদে সম্প্রদায়ের চুড়ির দোকান। আজও সেই ঐতিহ্যের অনেকটাই টিকে আছে। মেলায় পাওয়া যায় কুটিরশিল্প, মৃৎশিল্প, কাঠের খেলনা, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, গ্রামীণ আসবাব, অলংকার, মিষ্টি, খই, মুড়কি, খেলনা ও নানান ধরনের লোকজ পণ্য। এটি শুধু ধর্মীয় সমাবেশ নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় মৌসুমি কেন্দ্র।
ধামরাইয়ের রথযাত্রার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। রথ উৎসবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ অংশ নেন। ফলে রথযাত্রা কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
এবারের রথযাত্রাকে ঘিরেও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আয়োজক কমিটিও বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করে উৎসবকে সুষ্ঠু ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে। রথের সংস্কার, রং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষ করে শিল্পীরা আবারও প্রমাণ করেছেন-ঐতিহ্য কেবল সংরক্ষণ নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করার দায়িত্বও।
ধামরাইয়ের যশোমাধবের রথ আজ শুধু কাঠ, লোহা কিংবা রঙের সমষ্টি নয়। এটি এদেশের ইতিহাস, বিশ্বাস, শিল্প, লোকসংস্কৃতি এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার প্রতীক। যে রথ একদিন পাকিস্তানি বাহিনীর আগুনে পুড়ে সাত দিন জ্বলেছিল, সেই রথের উত্তরসূরি আজও হাজারো মানুষের টানে এগিয়ে চলে। ইতিহাসের চাকা যেমন থেমে থাকে না, তেমনি ধামরাইয়ের রথযাত্রাও প্রমাণ করে-ঐতিহ্যকে ধ্বংস করা যায় না; তাকে কেবল নতুন প্রজন্মের হাতে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে দেখা যায়।




