বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আগস্টজুড়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার পর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কীটতত্ত্ববিদদের পূর্বাভাস, শুধু সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩২৪ জন, যা এ বছর এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সর্বোচ্চ সংখ্যা। ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যাও ইতোমধ্যে শতক ছাড়িয়েছে।
আগস্টেই আক্রান্ত সাড়ে ২০ হাজার
আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। শুধু এই এক মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় সাড়ে ২০ হাজার রোগী। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্তের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগ।
মৃত্যুর দিক থেকেও ঢাকা এগিয়ে। বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেই মারা গেছেন ৩৬ জন। আগস্টে সর্বোচ্চ ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, জুলাইয়ে মারা গেছেন ৩৬ জন। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিনেই ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকার বাইরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরেও আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাড়বে ঝুঁকি
বাংলাদেশে সাধারণত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, এ বছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর বাংলাদেশের জন্য কঠিন সময় হতে পারে। তিনি জানান, মশা ও লার্ভার ওপর নিয়মিত নজরদারি, এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। নজরদারিতে দেখা গেছে, ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় এডিস মশার ঘনত্ব রয়েছে।
সরকারি হিসাবের বাইরেও বিপুল রোগী
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হিসাবে যে আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। অধ্যাপক কবিরুল বাশারের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের অন্তত ছয় গুণ। কারণ, সরকারি পরিসংখ্যানে মূলত হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্যই বেশি আসে। অনেক রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নেন। আবার সব হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র থেকেও নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান ডেঙ্গু পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
নারী মৃত্যুহারে এগিয়ে
চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। অন্যদিকে মৃতদের প্রায় ৫৭ শতাংশ নারী। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং পারিবারিক দায়িত্বের কারণে অনেক নারী সময়মতো হাসপাতালে না যাওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।
এডিস নিয়ন্ত্রণেই সমাধান
বর্ষায় বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে এডিস মশার প্রজননস্থল বাড়ে। বিভিন্ন পাত্র, ড্রাম, কাটা বাঁশের গর্ত, গাছের গোড়া কিংবা জমে থাকা পানিতেও এডিসের লার্ভা তৈরি হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো স্থানে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সাধারণভাবে মশা নিধন করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোথায় এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে সেই জায়গায় লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বর্ষার আগেই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে দ্রুত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




