ভিনিউজ ডেস্ক: বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির দুই নেতা আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রত্যাশিত বৈঠক আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বাণিজ্য, শুল্ক, বিরল খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, তাইওয়ানসহ একাধিক স্পর্শকাতর ইস্যুতে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যেই এই বৈঠক হতে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-এবার কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলবে, নাকি আগের মতোই সাময়িক সমঝোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে দুই দেশের সম্পর্ক?
চলতি বছর মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শির বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কিছুটা কমেছিল। সেই বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে দুটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির পাশাপাশি বিরল খনিজ সরবরাহ, মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্র-চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মৌলিক কোনো সমাধান আনতে পারেনি। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও মে মাসের বৈঠকের পর দুই দেশকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার একই জায়গায় ফিরে যেতে দেখা গেছে।
এবারের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বাণিজ্য-সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানো। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে একটি ভঙ্গুর বাণিজ্যবিরতি কার্যকর রয়েছে, যার মেয়াদ নভেম্বরের ১০ তারিখে শেষ হওয়ার কথা। ফলে ওয়াশিংটনের আলোচনায় শুল্ক কমানো, চীনা বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং চীনের পক্ষ থেকে মার্কিন কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে বিরল খনিজের সরবরাহও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও এবার আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উন্নত প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং চীনের পাল্টা অবস্থানের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের একটি কাঠামো তৈরির বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ সম্পর্কটি এখন শুধু শুল্ক ও বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে বড় ধরনের সমঝোতার পথে বাধাও কম নয়। তাইওয়ান, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতা-প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের অবস্থানে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণেও উচ্চ শুল্ক, বিরল খনিজের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে দুই দেশের সম্পর্কের বড় অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চীনা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মেরিকসের বিশ্লেষণেও ইঙ্গিত মিলেছে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের লক্ষ্য এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ করা নয়, বরং সেটিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। মে মাসের বৈঠক সম্পর্কেও চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, দুই দেশ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেটানোর চেয়ে তা পরিচালনা করার পথেই এগোচ্ছে।
তাই ওয়াশিংটনের বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ঐতিহাসিক চুক্তির প্রত্যাশার চেয়ে ছোট ছোট সমঝোতার দিকে নজর থাকবে। বাণিজ্যবিরতি আরও কিছুদিন বাড়ানো, শুল্কে সীমিত ছাড়, কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানো, বিরল খনিজ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা-এসব অগ্রগতি হলেও তা যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটাবে না। বরং বৈঠকটি দুই দেশের সম্পর্ককে সংঘাতের বদলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার পথে রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও বৈঠকটির গুরুত্ব অনেক। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে শুল্কযুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের বাজারে। আর যদি দুই নেতা অন্তত বাণিজ্যবিরতি বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তা আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্প ও শির ব্যক্তিগত সম্পর্কের নয়—দুই পরাশক্তি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কতটা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে, তারও পরীক্ষা হবে এই বৈঠক।




