১০৩ বছর পর নতুন বনবিড়ালের সন্ধান, বলিভিয়ার জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল ১৪ লাখ বছরের রহস্য

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : মানুষের চোখের আড়ালে, ঘন অরণ্যের গভীরে প্রায় ১৪ লাখ বছর ধরে টিকে ছিল একটি প্রাণী। আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের বহু আগেই অন্য বনবিড়ালদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল তার বিবর্তনের পথ। অথচ এত দীর্ঘ সময়েও বিজ্ঞানীদের কাছে তার অস্তিত্ব ছিল অজানা। অবশেষে বলিভিয়ার ইয়ুঙ্গাস অরণ্যে সেই রহস্যের পর্দা উঠেছে। জিনগত গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন বনবিড়ালের সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। নাম দেওয়া হয়েছে ‘লেপার্ডাস তিল্কায়ো’।

শুধু নতুন একটি প্রাণীর সন্ধান নয়, এই আবিষ্কারকে বিরল বলছেন বিজ্ঞানীরা আরও একটি কারণে। ১৯২৩ সালে উরুগুয়েতে পাম্পাস ক্যাটের সন্ধান পাওয়ার পর দীর্ঘ ১০৩ বছরে নতুন কোনো বিড়াল প্রজাতি আবিষ্কারের ঘটনা ঘটেনি। ফলে বলিভিয়ার জঙ্গলে তিল্কায়োর সন্ধান বিজ্ঞান ও জীববৈচিত্র্য গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে একজন তরুণ গবেষকের কৌতূহল। ২০১৬ সালে বলিভিয়ার মেঘে ঢাকা ইয়ুঙ্গাস অরণ্যে গবেষক পাওলা নোগালেস-আস্কারান্‌জ একটি বনবিড়াল দেখতে পান। স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অবস্থায় প্রাণীটির দেখা পেয়েছিলেন তিনি। প্রথম নজরে সেটিকে পরিচিত ‘টাইগার ক্যাট’ বলেই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু প্রাণীটির শরীরের গঠন, রং ও দাগের মধ্যে এমন কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য পাওলা লক্ষ করেন, যা তাঁর কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়।সেই কৌতূহলই শেষ পর্যন্ত বহু বছরের গবেষণার দরজা খুলে দেয়।

দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে টাইগার ক্যাটের দেখা পাওয়া যায়। নামের মধ্যে ‘টাইগার’ থাকলেও বাঘের সঙ্গে এদের সরাসরি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নেই। কোটি কোটি বছর আগে একই আদিম পূর্বপুরুষ থেকে বাঘ ও বিড়ালের বিবর্তনের পথ আলাদা হয়ে যায়। টাইগার ক্যাট নামটি মূলত তাদের শরীরের ছোপযুক্ত নকশার কারণে প্রচলিত হয়েছে, যা অনেকটা চিতাবাঘের মতো।

দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীরা টাইগার ক্যাটদের একটিমাত্র প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন। পরে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাণীদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বিস্তৃতি ও জিনগত গঠন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ৩৮টি বনবিড়ালের ডিএনএ বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, একই গোত্রের এই প্রাণীদের মধ্যে জিনগত পার্থক্য যথেষ্ট গভীর।

এই গবেষণার ধারাবাহিকতায় আগে পরিচিত চারটি উপপ্রজাতিকে পৃথক প্রজাতির মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু পাওলার দেখা প্রাণীটির ক্ষেত্রে দেখা গেল, সেটি ওই চারটির কোনোটির সঙ্গেই পুরোপুরি মেলে না। জিনগত পরীক্ষায় স্পষ্ট হয়, তিল্কায়ো তাদের থেকে আলাদা। অর্থাৎ এত দিন মানুষের অজান্তেই টিকে ছিল বনবিড়ালের আরেকটি স্বতন্ত্র প্রজাতি।

গবেষণায় নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করা বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবিষয়ক বিজ্ঞানী জোনাস লেসক্রোয়ার্ট জানিয়েছেন, শুধু বাহ্যিক চেহারা দেখে টাইগার ক্যাটদের আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন। জিনগত বিশ্লেষণই তাদের বিবর্তনের প্রকৃত ইতিহাস বুঝতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজি’-তে।

জিনগত তথ্য আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য সামনে এনেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে তিল্কায়ো অন্যান্য টাইগার ক্যাট থেকে বিবর্তনের দিক দিয়ে আলাদা হয়ে যায়। অর্থাৎ আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই এই প্রাণীর আলাদা একটি বংশধারা পৃথিবীতে ছিল।

তবে আকারে তিল্কায়ো মোটেও ভয়ংকর কোনো শিকারি নয়। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ ইঞ্চি এবং ওজন আনুমানিক ১ দশমিক ৪ কিলোগ্রাম। অনেক পোষা বিড়ালের চেয়েও ছোট এই প্রাণীর শরীর হালকা খয়েরি রঙের। গায়ে রয়েছে চিতাবাঘের মতো ছোপ ছোপ দাগ। জঙ্গলে ক্যামেরা বসিয়ে প্রাণীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন, ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণী এর প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে।

আবিষ্কারের আনন্দের পাশাপাশি তিল্কায়োর ভবিষ্যৎ নিয়ে অবশ্য উদ্বেগও বাড়ছে। এখন পর্যন্ত এই প্রজাতির মাত্র দুটি জীবন্ত প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একটি প্রায় ১০ বছর বয়সি পুরুষ তিল্কায়ো। বর্তমানে সেটিকে সেন্দা ভার্দে অভয়ারণ্যে রাখা হয়েছে। ফলে প্রকৃতিতে এই প্রাণীর প্রকৃত সংখ্যা কত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা তাদের আবাসস্থল। তিল্কায়োর বাস ইয়ুঙ্গাস অরণ্য ক্রমেই বন উজাড়, কৃষির সম্প্রসারণ, ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ এবং খননকাজের চাপের মুখে পড়ছে। অরণ্যের যে অংশ এখনও অক্ষত রয়েছে, তা দ্রুত সংরক্ষণের আওতায় না আনলে তিল্কায়োর মতো বিরল প্রাণী বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন বা আইইউসিএনও নতুন গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে টাইগার ক্যাটদের সংরক্ষণ পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনা করবে। সেই মূল্যায়নের পর তিল্কায়ো প্রজাতি কতটা বিপন্ন, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

এদিকে পেরুর ইয়ুঙ্গাস অরণ্যেও টাইগার ক্যাটের আরেকটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর সন্ধান মিলেছে। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘লেপার্ডাস টাইগ্রিনাস আন্টিসুয়ো’। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার অরণ্য যে এখনো জীববৈচিত্র্যের অসংখ্য অজানা রহস্য লুকিয়ে রেখেছে, তিল্কায়োর আবিষ্কার যেন তারই আরেকটি প্রমাণ।

বিজ্ঞানীদের কাছে এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এখানেই। পৃথিবীতে মানুষ যত প্রাণীর কথা জানে, তার বাইরেও অসংখ্য প্রজাতি হয়তো এখনো অরণ্য, পাহাড়, জলাভূমি কিংবা দুর্গম অঞ্চলে টিকে আছে। তাদের অনেকের অস্তিত্ব জানা যাবে হয়তো আগামী দিনে। আবার অনেককে হয়তো চেনার সুযোগই পাওয়া যাবে না, যদি তাদের আবাসস্থল তার আগেই ধ্বংস হয়ে যায়।

তিল্কায়ো তাই শুধু ১০৩ বছর পর আবিষ্কৃত নতুন এক বনবিড়ালের নাম নয়। এটি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতারও একটি স্মারক। যে প্রাণীটি মানুষের অজান্তে ১৪ লাখ বছর ধরে টিকে থাকতে পেরেছে, তাকে মানুষের কারণেই যেন হারিয়ে যেতে না হয়-নতুন এই আবিষ্কার সেই সতর্কবার্তাই আরও জোরালো করে তুলেছে।

পূর্বের খবরবিবিসি প্রতিবেদন : বিশ্ববাজারে কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সেভাবে কমে না কেন?
পরবর্তি খবরট্রাম্প-শি বৈঠকে কতটা বরফ গলবে?
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!