ভিনিউজ : ইয়েমেনের উপকূলীয় তিহামাহ অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই সৌদি-সমর্থিত হুথিবিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স জোটের নিয়ন্ত্রণে থাকা লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে হুথিরা। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উপকূল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘ ১২ বছরের গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানের পরও হুথিদের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করছে, ইয়েমেনে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর হুথিদের বাড়তে থাকা প্রভাব। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। হুথিরা যদি এই অঞ্চলের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের নজরদারি ও হামলার সক্ষমতা আরও বাড়বে। অতীতে ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে লোহিত সাগরে জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। যদিও হুথিরা এখন সৌদি ছাড়া অন্য দেশের জাহাজকে নিরাপদ বলছে, অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ইরানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরান সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়েও তার আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ার সাবেক আসাদ সরকারের দুর্বলতা ও পরাজয়ের পর তেহরানের জন্য ইয়েমেনের হুথিরা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে হুথিদের সরাসরি ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের ইরানি সহায়তা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধের সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব-দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথেই ইরান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সময়ে বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। ফলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন হুথিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালি কোনো কারণে বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে গেলে এই পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠবে। ফলে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রা শুধু সৌদি সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি দেশটির অর্থনীতি ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, তারা আবার ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি সামরিকভাবে জড়াবে কি না। অতীতে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা হলেও নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালানোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় অবশ্য ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য। দীর্ঘ ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটির লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, ক্ষুধার্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধকে আবারও উসকে দেয়, তাহলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাবকে কেন্দ্র করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকট ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে। তাই হুথিদের এই বিদ্যুৎগতির অগ্রযাত্রা শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের নতুন অধ্যায় নয়; ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।




