ভিনিউজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। দুই দেশ ন্যাটোর সদস্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং আর্কটিক অঞ্চলেও রয়েছে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তারপরও একসময়ের অকল্পনীয় একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া তার সরকারের দায়িত্ব। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেছেন, এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত কম।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি কানাডার উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। পাশাপাশি তার শুল্কনীতি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডা এবার সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক আগ্রাসনকেও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার আওতায় আনছে।

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই মনে করেন, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ৩৪ বছর দায়িত্ব পালন করা সাবেক লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হবে অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় কল্পনাতীত। তার সামরিক জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার ওপর হামলার সম্ভাবনা কখনো বিবেচনা করা হয়নি।
এর পেছনে বড় কারণ দুই দেশের গভীর সামরিক সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয়ই ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর নীতি অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। এছাড়া নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের অধীনে দুই দেশ আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে।
তবুও কানাডার বর্তমান প্রস্তুতির পেছনে ইতিহাসেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। দুই দেশ সবসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল না। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বাহিনী মন্ট্রিয়েল দখল করেছিল এবং কুইবেক সিটি দখলেরও চেষ্টা করেছিল। পরে ১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী কানাডার বিভিন্ন অংশে হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ বাহিনী ওয়াশিংটনে হামলা চালিয়ে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের কথা মাথায় রেখে কানাডা গোপনে সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছিল। সে সময় কানাডার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পর্যটকের ছদ্মবেশে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে গিয়ে সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য শত্রু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন। সামরিক গবেষকদের মতে, যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা সামরিক বাহিনীর স্বাভাবিক দায়িত্ব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডার সামরিক পরিকল্পনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে। একটি সামরিক মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো এক সপ্তাহের মধ্যেই দখল হয়ে যেতে পারে। সংখ্যাগতভাবে পিছিয়ে থাকা কানাডার সেনাবাহিনী তখন গেরিলা-ধাঁচের যুদ্ধকৌশলে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্রদের কাছে সামরিক সহায়তা চাওয়া হতে পারে।
কানাডা এরই মধ্যে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও ভাবছে। দেশটির প্রতিরক্ষা প্রধান সামরিক বাহিনীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ অপেক্ষাকৃত স্বল্প-প্রশিক্ষিত নাগরিক সৈন্য যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।
তবে সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে থাকলেও কানাডায় যুদ্ধ শুরু করা ওয়াশিংটনের জন্যও সহজ হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন যুদ্ধে মার্কিন জনগণ ও সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে। দুই দেশের সেনারা নিয়মিত একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয় এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে সংঘাত সত্যিই শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ-বিশেষ করে তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অচল করে দেওয়ার কৌশলও নেওয়া হতে পারে।
সব মিলিয়ে কানাডার এই প্রস্তুতি সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস নয়। বরং বদলে যাওয়া বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে অসম্ভব পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত থাকার কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা এখনো অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু ট্রাম্পের নীতি ও ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ মন্তব্যের পর কানাডার কাছে সেই অসম্ভব সম্ভাবনাটিকেও আর পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।




