পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতির পথে:মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা

 

আদিত্য রায়হান

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ :,ঠাকুরগাঁওয়ের এক তরুণ ছাত্রনেতা থেকে দেশের রাষ্ট্রপতি ভবনের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব-একটির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঘোষণা করেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান রিজভী।

আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া কার্যত নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে সবকিছু ঠিক থাকলে ২০ আগস্টের ভোটের পর দেশের রাষ্ট্রপতি পদে নতুন অধ্যায় শুরু করবেন দীর্ঘদিনের এই বিএনপি নেতা।

জন্ম ও রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি সংসদ সদস্য এবং কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে রাজনীতি তাঁর কাছে অপরিচিত কোনো জগত ছিল না।

তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এই রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার থাকলেও মির্জা ফখরুলের নিজের রাজনৈতিক পথচলা ছিল দীর্ঘ ও নানা বাঁকে ভরা।

ছাত্রজীবনে রাজনীতির হাতেখড়ি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালে ষাটের দশকে মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে প্রবেশ। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি ছাত্ররাজনীতির সামনের সারিতে ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাঁকে গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়। তবে স্বাধীনতার পর তিনি সরাসরি সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে না গিয়ে পেশাজীবন বেছে নেন।

শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি

১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গে কাজ করেন।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগ পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন।

পৌর চেয়ারম্যান থেকে বিএনপিতে

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকার পরিচালনার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।

সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফখরুল। এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে জয়ী হন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অবশ্য তিনি পরাজিত হন।

বিএনপির মহাসচিব

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর প্রায় এক দশক তিনি দলটির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে রাজনীতি করেছেন।

বিএনপির আন্দোলন, নির্বাচন, সরকারবিরোধী কর্মসূচি এবং দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুল ছিলেন দলের সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতাদের একজন। এ সময়ে তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়েছে।

২০২৬: মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের পথে

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মির্জা ফখরুল। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে আরও বড় পরিবর্তন।

১৩ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে ঘোষণা করা হয়, দেশের রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কারণে তিনি বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

২০ আগস্টের অপেক্ষা

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

অর্থাৎ, প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনের পর আগামী ২০ আগস্ট তাঁর সামনে খুলে যাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটি-রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা।

ছাত্র রাজনীতি থেকে যার পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই মির্জা ফখরুল পেরিয়েছেন শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ, সরকারি প্রশাসন, ঠাকুরগাঁও পৌরসভা, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দীর্ঘ পথ। এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-রাষ্ট্রপতি পদ।

একসময় যিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব সামলেছেন, তিনিই এখন দেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ২০ আগস্টের সংসদীয় ভোট তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে-এমনটাই এখন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

পূর্বের খবরসীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু : অনাগত সন্তানকে রেখে গেলেন পলাশ, ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি
পরবর্তি খবরগ্যাস সংকট : বিপর্যস্ত জনজীবন ও শিল্প, ঘাটতি ১৭৭ কোটি ঘনফুট
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!