ভিনিউজ ডেস্ক: তালিবানের শাসন থেকে বাঁচতে একদিন পুরুষের ছদ্মবেশে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। নিজের দেশ, পরিবার, পরিচিত পরিবেশ-সবকিছু পেছনে ফেলে আশ্রয় নিতে হয়েছিল ইতালিতে। পাঁচ বছর ধরে দেশে ফিরতে পারেননি। কিন্তু সেই আফগানিস্তানের নামই এবার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে উজ্জ্বল করলেন ফারিবা হাশিমি। মহিলাদের ব্যক্তিগত সাইক্লিংয়ে রুপোর পদক জিতে তিনি শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করেননি, তাঁর পদক যেন তালিবান-শাসিত আফগানিস্তানের লাখ লাখ নারীর জন্যও এক প্রতীকী বার্তা হয়ে উঠেছে।
২৩ বছর বয়সী ফারিবা বুধবার এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ব্যক্তিগত সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় রুপো জেতেন। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক্সেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পদক না পেলেও এশিয়ান গেমসে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন। ২০০২ সালের পর এশিয়ান গেমসে আফগানিস্তানের কোনও নারী ক্রীড়াবিদের পদক জয়ের ঘটনা ঘটেনি। ফলে ফারিবার রুপো দেশটির নারী ক্রীড়ার ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
পদক জয়ের পর ফারিবা বলেন, এশিয়ান গেমসে আসার সময় তাঁর একটাই স্বপ্ন ছিল-পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে দেশের জন্য গর্ব বয়ে আনা। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও জানান তিনি।
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ভয়, লড়াই আর দেশত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস। ২০২১ সালে তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর দেশটির নারীদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেই পরিস্থিতিতে ফারিবার জন্য নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়ে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে ইতালিতে আশ্রয় নেন তিনি। এখনও সেখানেই বসবাস করছেন এই সাইক্লিস্ট।
ফারিবার শৈশবও ছিল সহজ নয়। উত্তর আফগানিস্তানের ফারিয়াব প্রদেশে বেড়ে ওঠা এই তরুণী মাত্র ১৫ বছর বয়সে সাইক্লিং শুরু করেন। নিজের সাইকেলও ছিল না তাঁদের। প্রতিবেশীর কাছ থেকে সাইকেল ধার নিয়ে অনুশীলন করতেন তিনি ও তাঁর বোন ইয়ুল্দুজ। পরে বোনও সাইক্লিংয়ে যুক্ত হন।
২০১৭ সালে প্রথমবার একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ফারিবা। তখন শরীর, হাত-পা ও মুখ ঢেকে সাইক্লিং করতে হয়েছিল তাঁকে। সেই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন ফারিবা, আর দ্বিতীয় হন তাঁর বোন ইয়ুল্দুজ। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁদের পরিচিতি।
ফারিবা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সাইকেল চালানোর সময় তাঁর মনে হতো তিনি যেন একটি পাখি—উড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ফারিয়াবের মতো রক্ষণশীল পরিবেশে মেয়েদের সাইক্লিং করা সহজ ছিল না। বাইরে বেরোলেই তাঁকে ছেলের পোশাক পরতে হতো। ধীরে ধীরে দুই বোনের পরিচিতি বাড়তে থাকলে তাঁদের ওপর সামাজিক চাপও বাড়তে থাকে।
এক পর্যায়ে ইয়ুল্দুজ দুর্ঘটনার শিকার হন। ফারিবার ভাষ্য অনুযায়ী, এক অটোরিকশাচালক তাঁর বোনকে ধাক্কা দিলে তাঁর কব্জি ভেঙে যায়। সেই ঘটনার পর তাঁদের বাবা মেয়েদের সাইক্লিং চালিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও ভয় ছিল তাঁর।
কিন্তু ফারিবা থেমে যাননি। দেশ ছাড়ার পর ইতালিতে গিয়ে নতুন করে নিজের ক্রীড়া জীবন গড়ে তোলেন। ইতালির সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আলেসান্দ্রা কাপেলোত্তোর অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। কঠিন সময় পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা করে নেন তিনি।
এবার এশিয়ান গেমসে রুপো জয়ের পর ফারিবার কণ্ঠে তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের আনন্দ নয়, ছিল আফগান নারীদের কথাও। তিনি বলেন, এই রুপো আফগানিস্তানের নারীদের শক্তি দেবে। তিনি একা নন, তাঁর পেছনে রয়েছেন লাখ লাখ নারী-যাঁরা প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখেন।
ফারিবার এই সাফল্য তাই একটি পদকের গল্পের চেয়েও বড়। যে দেশে মেয়েদের সাইকেল চালানোই একসময় ছিল সামাজিক বাধার বিষয়, সেই দেশের এক তরুণী আজ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে উঠে নিজের দেশের পতাকার জন্য পদক জিতেছেন। দেশ থেকে দূরে থেকেও তিনি যেন প্রমাণ করলেন—স্বপ্নকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু সবসময় থামিয়ে রাখা যায় না।




