গ্যাস সংকট : বিপর্যস্ত জনজীবন ও শিল্প, ঘাটতি ১৭৭ কোটি ঘনফুট

 

ভিনিউজ ডেস্ক : দেশে গ্যাস সংকট এখন আর শুধু বাসাবাড়ির চুলা কিংবা সিএনজি স্টেশনের সমস্যা নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরা দিনের বড় সময় গ্যাসের চাপ পাচ্ছেন না। কোথাও চুলা জ্বলছে না, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও রান্না শেষ করা যাচ্ছে না। একই সময়ে সিএনজি স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সারি। ফলে গ্যাস সংকট ক্রমেই জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

১৪ আগস্টের বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি থেকে দেখা যায়, ঢাকার অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না করতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। মিরপুরের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, চুলায় রান্না বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দারা বাড়তি খরচে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ গ্যাসের বিল দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির খরচও বহন করতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে।

পরিবহন খাতেও সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট। গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনে গাড়িকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। চালকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, শুধু গ্যাস নিতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সিরিয়ালে থাকতে হচ্ছে। এতে একদিকে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে চালকদের আয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গত ১২ আগস্ট থেকে জেলার পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ হলেও সংকটের আগে চাপ নেমে এসেছিল ১৫ পিএসআই থেকে মাত্র ৩-৪ পিএসআইয়ে। সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর অনেক চালক এলপিজিতে গাড়ি চালাচ্ছেন এবং এতে ভাড়াও বেড়েছে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে শিল্পখাতে। হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বুধবার বিকেল থেকে অধিকাংশ কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছোট-বড় অর্ধশতাধিক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা কাজ করেন। সেখানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় পার্কের সব কারখানার উৎপাদন থেমে গেছে। যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কেও দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল; পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

গ্যাসনির্ভর শিল্পের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি খাতও ঝুঁকিতে পড়েছে। হবিগঞ্জের বিভিন্ন কারখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস দিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন চালানো হলেও এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে অর্ডার বাতিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস না থাকায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; ফলে উৎপাদন ও বিদ্যুৎ-দুই দিক থেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গ্যাস সংকট এখন নিত্যপণ্যের উৎপাদনেও আঘাত করেছে। নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিনি, গম, সয়াবিনবীজ ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ১২টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে বাজারে সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যান্য বড় শিল্পগোষ্ঠীতেও একই চিত্র। টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার ২০টি বন্ধ রয়েছে। নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে প্রায় ৪০ শতাংশে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কোনো কোনো কারখানা সীমিত উৎপাদন চালালেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের তিনটি বড় কারখানাও বন্ধ রয়েছে।

এই সংকটের মূল চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয় জাতীয় গ্যাস সরবরাহের পরিসংখ্যানে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৩৮৫ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ থাকে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর বন্ধ হয়ে যায়। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ৬ আগস্ট আংশিকভাবে চালু হলেও ১২ আগস্ট পর্যন্ত টার্মিনালটি প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলছিল। এরপর বুধবার গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ২০৩ কোটি ঘনফুটে। প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট।

এদিকে মহেশখালীর অন্য এলএনজি টার্মিনালও বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে সরবরাহ করতে না পারায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট বিদ্যুৎ সংকটকেও সরাসরি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে আপাতত বাজারে নিত্যপণ্যের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি। শিল্পগোষ্ঠীগুলোর গুদামে আগে থেকে থাকা প্রক্রিয়াজাত পণ্য বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকায় মজুত দ্রুত কমছে। এক-দুই দিনের উৎপাদন ব্যাঘাত সামাল দেওয়া গেলেও সংকট দীর্ঘ হলে নিত্যপণ্যের সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

গ্যাস সরবরাহকারী জালালাবাদ গ্যাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় পর্যায়ে সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে শিল্পে সরবরাহ কমাতে হয়েছে। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে তারা আশা করছেন। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এলএনজি সংকট কাটতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নিশ্চিত নয়।
সব মিলিয়ে বর্তমান গ্যাস সংকটকে বিচ্ছিন্ন জ্বালানি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে মানুষের রান্নাঘর, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ এবং নিত্যপণ্যের বাজারকে প্রভাবিত করছে। তাই এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, অবকাঠামোগত সক্ষমতা শক্তিশালী করা, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সমন্বিত সরবরাহ পরিকল্পনা এবং সংকটকালে নিত্যপণ্যের বাজারে কঠোর নজরদারি জরুরি। কারণ গ্যাসের সংকট যত দীর্ঘ হবে, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত তত গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্বের খবরপৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রপতির পথে:মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা
পরবর্তি খবররানির মুকুটে নতুন পালক, লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!