ভিনিউজ ডেস্ক:প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের চীন সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সফরের শেষে প্রকাশিত ১৫ দফার যৌথ ঘোষণাপত্রে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’-এ উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতা, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে ২২ থেকে ২৬ জুন দেশটি সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের শেষ দিনে তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দিতে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বৈঠকে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আলোচনায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের প্রস্তাবও উঠে এসেছে। পাশাপাশি বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়েও দুই দেশ কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
যৌথ ঘোষণাপত্রে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের কারিগরি সহযোগিতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়েও সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামো, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের সব পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা অব্যাহত রাখায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিরক্ষা খাতে সামরিক প্রতিনিধি বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করবে দুই দেশ।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, যুব ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে বেইজিং।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং বাণিজ্য, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।




