বিশেষ প্রতিবেদন
জিহাদুল ইসলাম
ভিনিউজ : পুরান ঢাকার সরু অলিগলি, শতবর্ষী দালান আর ইতিহাসের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহ্যের গল্প। সেই গল্পের অন্যতম একটি অধ্যায় মহররম। হিজরি বছরের প্রথম মাস এলেই রাজধানীর প্রাচীন অংশে নেমে আসে এক ভিন্ন আবহ। কালো পোশাকে হাজারো মানুষের পদচারণা, বুক চাপড়ে ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’ ধ্বনি, হাতে লাল-সবুজ আলম, সামনে প্রতীকী ঘোড়া ‘দুলদুল’ সব মিলিয়ে যেন ইতিহাস আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে। চার শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ঢাকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সম্প্রীতির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
মহররমের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু কারবালার সেই শোকাবহ ঘটনা। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম, বর্তমান ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.), তাঁর পরিবারের সদস্য এবং অল্পসংখ্যক সঙ্গী ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করে শাহাদত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই আত্মত্যাগ সত্যের জন্য আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতি বছর শিয়া সম্প্রদায় গভীর শোকের মধ্য দিয়ে মহররম পালন করেন। অন্যদিকে সুন্নি মুসলমানরা আশুরার দিন নফল রোজা, ইবাদত-বন্দেগি ও দোয়ার মাধ্যমে দিনটি পালন করেন।
বাংলায় মহররমের ঐতিহ্যের সূচনা মুঘল আমলে। ইতিহাসবিদদের মতে, সম্রাট শাহজাহানের পুত্র এবং বাংলার সুবেদার শাহ সুজার শাসনামলে বাংলায় শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। সেই সময় থেকেই ঢাকায় মহররম পালন এবং তাজিয়া মিছিলের প্রচলন ঘটে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৬৪২ সালে নওয়ারা মহলের দারোগা মীর মুরাদ স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর বর্তমান হোসেনী দালান ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। এরপর থেকেই এটি মহররম পালনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তবে ইতিহাস আরও জানায়, ঢাকায় মহররমের প্রচলন সম্ভবত এরও আগে শুরু হয়েছিল। ১৬০০ সালের দিকে ফরাশগঞ্জ এলাকায় ‘বিবি কা রওজা’ নামে একটি ইমামবাড়া নির্মিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ও অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর গবেষণায়ও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে ধারণা করা হয়, ইসলাম খাঁর ঢাকায় আগমনের আগেই এই শহরে মহররমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল।
পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত হোসেনী দালান শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের শিয়া মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্র। প্রথম নির্মাণের পর অষ্টাদশ শতকে নায়েব নাজিম জেরাসত খান ভবনটি পুনর্নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলেও এর গুরুত্ব অটুট ছিল। ঐতিহাসিক জেমস টেলর লিখেছেন, মহররমের আয়োজনের জন্য কোম্পানি সরকার ঢাকার নায়েব নাজিমদের প্রতি বছর আড়াই হাজার টাকা বরাদ্দ দিত। নবাব আমলে হোসেনী দালান শুধু ধর্মীয় কেন্দ্রই ছিল না; এর প্রাঙ্গণে বসত বিশাল মেলা। সেখানে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও সমান উৎসাহে অংশ নিতেন। ফলে মহররম একসময় পুরান ঢাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে।
আজ মানুষ মূলত আশুরার দিনের তাজিয়া মিছিল দেখলেও অতীতে ঢাকায় মহররম উপলক্ষে তিনটি বড় শোকযাত্রা বের হতো। আট মহররমে অনুষ্ঠিত হতো ‘সামরাত কি মিছিল’ বা সন্ধ্যার মিছিল। নয় মহররমে বের হতো ‘ভোররাত কি মিছিল’। আর দশ মহররম সকালে অনুষ্ঠিত হতো সবচেয়ে বড় ‘মঞ্জিলের মিছিল’। এই শোকযাত্রা হোসেনী দালান থেকে শুরু হয়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নির্ধারিত স্থানে গিয়ে শেষ হতো।

‘তাজিয়া’ শব্দটি এসেছে আরবি ভাষা থেকে। এর অর্থ শোক প্রকাশ বা সমবেদনা জানানো। বিশেষ অর্থে তাজিয়া বলতে কারবালায় শহীদ ইমাম হোসেন (রা.)-এর প্রতীকী সমাধিকে বোঝায়। এই প্রতীকী সমাধি নিয়েই বের হয় শোকযাত্রা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়াটি কাঠের তৈরি এবং রূপার আবরণে মোড়ানো, যা নবাব সলিমুল্লাহর দান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাজিয়া মিছিলের অন্যতম আকর্ষণ ‘আলম’। এটি এক ধরনের প্রতীকী পতাকা বা দণ্ড, যার মাথায় ধর্মীয় প্রতীক থাকে। মিছিলে অংশ নেন বেহেশতা বা আলমবাহক, কাসেদ, বাদ্যকর এবং প্রতীকী অশ্বারোহী দল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ‘দুলদুল’ নামের সুসজ্জিত ঘোড়া, যা ইমাম হোসেন (রা.)-এর ঘোড়ার প্রতীক হিসেবে বহন করা হয়। অতীতে তরবারি, বর্শা, লাঠিখেলা ও যুদ্ধকৌশলের প্রদর্শন ছিল মিছিলের নিয়মিত অংশ। তবে নিরাপত্তার কারণে বর্তমানে এসবের অনেকটাই সীমিত করা হয়েছে।
একসময় মহররম এলেই পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় গড়ে উঠত আখড়া। নবাবগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, বংশাল, নিমতলী, জিন্দাবাহার, উর্দু রোড, গোয়ালনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তরুণরা কয়েক সপ্তাহ ধরে লাঠিখেলা, তরবারি চালনা এবং তাজিয়া নির্মাণের মহড়া দিতেন। মহল্লাভিত্তিক এই আখড়াগুলো শুধু ধর্মীয় প্রস্তুতির স্থান ছিল না; এগুলো ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্রও।
মহররম মানেই শুধু শোক নয়, ছিল উৎসবও। হোসেনী দালান, ফরাশগঞ্জ, বকশীবাজার ও আজিমপুরে বসত মহররমের ঐতিহ্যবাহী মেলা। বিশেষ করে আজিমপুরের মেলা ছিল সবচেয়ে বড়। খেলনা, মিষ্টি, হস্তশিল্প ও লোকজ পণ্যের সমাহারে মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এই মেলায় অংশ নিতেন, যা ঢাকার বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বাংলা সাহিত্যেও মহররমের স্মৃতি অম্লান। কবি শামসুর রাহমান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ছোটবেলায় নানীর সঙ্গে তিনি চকবাজারে গিয়ে মাঝরাতের মহররমের মিছিল দেখতেন। তাঁর সেই স্মৃতিচারণা থেকে বোঝা যায়, একসময় মহররম ছিল পুরান ঢাকার সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
সময়ের সঙ্গে তাজিয়া মিছিলের চেহারাও বদলেছে। আগে আত্মপ্রহার, লাঠিখেলা, তরবারি প্রদর্শন ও আগুনের খেলা ছিল মিছিলের পরিচিত দৃশ্য। এখন নিরাপত্তার স্বার্থে এসবের অনেকটাই সীমিত করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রতি বছর কঠোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মিছিলের পুরো পথজুড়ে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছুরি, তরবারি, বর্শা বা অন্য কোনো ধারালো অস্ত্র বহনের ওপরও থাকে নিষেধাজ্ঞা।
আজকের দিনে মহররমের তাজিয়া মিছিল শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের গবেষক, আলোকচিত্রী, ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকেরা এই ঐতিহ্য প্রত্যক্ষ করতে পুরান ঢাকায় ছুটে আসেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই শোকযাত্রা প্রমাণ করে, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েও তা বেঁচে থাকে।
কারবালার শিক্ষা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়-অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকতে হয়। তাই প্রতি বছর মহররম ফিরে এলে পুরান ঢাকার হোসেনী দালান আবারও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ওঠে। সময় বদলেছে, শহরের রূপ পাল্টেছে, মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু চার শতক আগে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য এখনো একইভাবে মানুষকে ইতিহাস, আত্মত্যাগ, সম্প্রীতি ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে চলেছে। সেই কারণেই মুঘল আমল থেকে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত ঢাকার মহররম পালন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি রাজধানীর বহুমাত্রিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য উত্তরাধিকার।




