কম বয়সেই কি হানা দিচ্ছে বন্ধ্যাত্ব? নারীদের যে ৩ লক্ষণ অবহেলা করা বিপজ্জনক

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : একসময় মনে করা হতো, নারীর জীবনে সন্তান ধারণের জন্য নির্দিষ্ট একটি বয়সই সবচেয়ে উপযুক্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে জীবনযাপন, কর্মক্ষেত্র, বিয়ে ও মাতৃত্বের পরিকল্পনা। এখন অনেক নারী ত্রিশের পর, এমনকি চল্লিশের কাছাকাছি বয়সেও মাতৃত্ব বেছে নিচ্ছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বেশি বয়সেও সফলভাবে মা হওয়া সম্ভব। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর প্রজননক্ষমতায় স্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন আসে। এর পাশাপাশি হরমোনের সমস্যা, অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ওজনের অস্বাভাবিকতা এবং কিছু গাইনোকোলজিক্যাল রোগ কম বয়সেও সন্তানধারণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বন্ধ্যাত্ব হঠাৎ করে তৈরি হয় না-অনেক ক্ষেত্রে শরীর আগে থেকেই কিছু সংকেত দিতে থাকে। সেই সংকেতগুলো সময়মতো শনাক্ত করতে পারলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে তিনটি লক্ষণকে অবহেলা না করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা-ঋতুস্রাবের অস্বাভাবিকতা, মাসিকের সময় বা আগে-পরে অসহ্য ব্যথা এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ।

প্রথম সতর্ক সংকেত: মাসিকের অনিয়ম

নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো নিয়মিত ঋতুচক্র। সাধারণভাবে মাসিক চক্র ব্যক্তিভেদে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে মাসিকের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন মাসিক না হওয়া, বারবার চক্রের পরিবর্তন হওয়া কিংবা অতিরিক্ত রক্তপাত-এসবকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

এর পেছনে থাকতে পারে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), থাইরয়েডের সমস্যা, ওজনের বড় ধরনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অতিরিক্ত শরীরচর্চা কিংবা অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যা।

কিছু নারীর ক্ষেত্রে জরায়ুর ফাইব্রয়েডের কারণেও অতিরিক্ত রক্তপাত ও ব্যথা হতে পারে। আবার ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত না হলে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।

তাই মাসিক কয়েক মাস ধরে অনিয়মিত হলে বা হঠাৎ স্বাভাবিক চক্রে বড় পরিবর্তন এলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দ্বিতীয় সংকেত: মাসিকের আগে-পরে অসহ্য ব্যথা

মাসিকের সময় হালকা বা মাঝারি ব্যথা অনেক নারীরই হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যথা যদি এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়, প্রতি মাসে একই ধরনের তীব্র ব্যথা হয় কিংবা মাসিক শুরুর কয়েক দিন আগেই ব্যথা শুরু হয়ে মাসিক শেষ হওয়ার পরও থাকে-তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষ করে তলপেট ও কোমরে তীব্র ব্যথার সঙ্গে মলত্যাগ বা প্রস্রাবের সময় ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক পেইন থাকলে এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো রোগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।

এন্ডোমেট্রিওসিসে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বেড়ে উঠতে পারে। এতে প্রদাহ, ব্যথা, সিস্ট এবং পেলভিক অঞ্চলে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউবও আক্রান্ত হয়। ফলে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তবে এন্ডোমেট্রিওসিস মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়। রোগের মাত্রা, বয়স, ডিম্বাশয়ের অবস্থা এবং অন্যান্য শারীরিক বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক নারীই পরবর্তীতে সফলভাবে সন্তানধারণ করেন।

তৃতীয় সংকেত: হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ বাইরে থেকেই বোঝা যায়। মুখ বা শরীরে পুরুষদের মতো অতিরিক্ত লোম, বারবার ব্রণ হওয়া, মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া, মাসিক অনিয়মিত হওয়া এবং মেজাজে ঘন ঘন পরিবর্তন-এসব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা গেলে PCOS-এর মতো হরমোনজনিত সমস্যার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

PCOS নারীদের মধ্যে ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা তৈরির অন্যতম কারণ। ফলে গর্ভধারণে সময় বেশি লাগতে পারে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।

স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের মাধ্যমে PCOS নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রয়োজনে সন্তানধারণের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাও নেওয়া হয়।

বয়স কেন গুরুত্বপূর্ণ?

নারীর প্রজননক্ষমতার ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন নারী জন্মের সময় নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে এবং সময়ের সঙ্গে তাদের গুণমানও হ্রাস পায়।

বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর প্রজননক্ষমতা কমার প্রবণতা বাড়ে এবং ৪০ বছরের পর এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে একই গতিতে ঘটে না। তাই বয়স বেশি হলেই সন্তান হবে না-এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি বয়সের বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।

কখনও কখনও কম বয়সেও ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। একে প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ইনসাফিসিয়েন্সি বা POI বলা হয়। এ ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

কখন পরীক্ষা করাবেন?

নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীর এক বছর এবং ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীর ছয় মাসেও গর্ভধারণ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সাধারণভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে মাসিক দীর্ঘদিন অনিয়মিত হওয়া, অসহ্য পেলভিক ব্যথা, এন্ডোমেট্রিওসিসের সন্দেহ, পূর্বে পেলভিক সংক্রমণ বা প্রজনন অঙ্গের অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকলে এক বছর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাফি, হরমোন পরীক্ষা, ডিম্বস্ফোটন মূল্যায়ন, AMH-এর মতো পরীক্ষা বা অন্যান্য প্রজননস্বাস্থ্য পরীক্ষা দিতে পারেন। তবে কোনও একটি পরীক্ষা দিয়ে একজন নারীর ভবিষ্যতে সন্তান হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

শুধু নারী নয়, পুরুষেরও পরীক্ষা জরুরি

সন্তানধারণে সমস্যা হলেই শুধু নারীর শরীরকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বন্ধ্যাত্বের কারণ নারী, পুরুষ অথবা উভয়ের ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান না এলে প্রয়োজন অনুযায়ী দুজনেরই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।

জীবনযাপনেও নজর দিন

প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর ওজন, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলাও জরুরি।

তবে কোনও উপসর্গ দেখা দিলে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে কারণ শনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্বের খবরঅবশেষে কি খুলছে সালমান শাহর মৃত্যুর জট? -ফিরে এসেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!