৩৯ সেকেন্ডে দুই দফা তাণ্ডব! ভূগর্ভে দুই টেকটোনিক পাতের সংঘাতেই বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলা

 

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি ছিল একটি বিরল ‘ডাবলেট’ ভূমিকম্প যেখানে প্রথম কম্পনের পরপরই একই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী দ্বিতীয় কম্পন আঘাত হানে। এই দ্বৈত আঘাতের মূল কারণ ভূগর্ভে ক্যারিবিয়ান প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের জটিল গতিবিধি।

বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে প্রথম ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.২। কম্পনের উৎস ছিল উত্তর ভেনেজুয়েলার স্যান সেবাস্তিয়ান ফল্ট। কিন্তু সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর, সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে একই ফল্ট ব্যবস্থার অন্য অংশে আরও শক্তিশালী ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পের ফলে ভূগর্ভে সৃষ্ট চাপ দ্রুত পাশের একটি সক্রিয় চ্যুতিতে ছড়িয়ে পড়ে। সেই অতিরিক্ত চাপই দ্বিতীয় ভূমিকম্পের জন্ম দেয়। দুটি কম্পনের উৎসস্থলের দূরত্ব ছিল মাত্র তিন মাইল এবং দ্বিতীয় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় মাইল গভীরে। অগভীর গভীরতায় উৎপন্ন হওয়ায় এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। কম্পনের প্রভাব ভেনেজুয়েলা ছাড়িয়ে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে।

রবিবার সকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১,৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। ধসে পড়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। অনেক এলাকায় এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া বহু মানুষের সন্ধান মেলেনি।

কেন ঘটল এই শক্তিশালী ভূমিকম্প?

ভেনেজুয়েলার উত্তরাংশ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ক্যারিবিয়ান প্লেট ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের পাশ ঘেঁষে অতিক্রম করছে। বছরে কয়েক মিলিমিটার করে এই প্লেট দুটির আপেক্ষিক গতির ফলে দীর্ঘদিন ধরে ফল্ট লাইনে বিপুল পরিমাণ চাপ জমা হয়। সেই চাপ নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই হঠাৎ শক্তি মুক্ত হয়ে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনায় প্রথম ভূমিকম্পই শেষ ছিল না। বরং সেটিই আশপাশের আরেকটি দুর্বল চ্যুতিকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দ্বিতীয়, আরও শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি হয়। ভূতত্ত্ববিদরা এই ধারাবাহিক ঘটনাকে ‘ডাবলেট আর্থকোয়েক’ নামে অভিহিত করেন।

‘ডাবলেট’ ভূমিকম্প কতটা বিরল?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে অধিকাংশ ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা পরাঘাত দেখা গেলেও একই মাত্রার কাছাকাছি শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প অল্প সময়ের ব্যবধানে হওয়া খুবই বিরল। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে পড়া ভবন ও অবকাঠামো দ্বিতীয় ধাক্কায় সহজেই ধসে পড়ে।

এর আগে ২০২৩ সালে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৭.৬ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। সেই বিপর্যয়ে দুই দেশে ৬২ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে ২০২৫ সালে মিয়ানমারেও শক্তিশালী ধারাবাহিক ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছিল বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।

তুরস্কের ভূকম্পন বিশেষজ্ঞ সুলেমান নালবান্টের গবেষণা অনুযায়ী, একটি ফল্টে শত শত বছর ধরে জমে থাকা চাপ প্রথম ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়ার পর সেই চাপ দ্রুত পাশের আরেকটি ফল্টে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন দ্বিতীয় ফল্টটিও ভেঙে শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। তাঁর মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক চাপ ও তাৎক্ষণিক শক্তি স্থানান্তরের একটি জটিল প্রক্রিয়া।

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় আবারও মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীর ভূগর্ভে টেকটোনিক প্লেটগুলোর অবিরাম চলাচল কখন যে ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে বলা এখনও সম্ভব নয়। তবে ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে উন্নত নির্মাণব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতিই প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পূর্বের খবরপে স্কেল বাস্তবায়নে ৫ সিদ্ধান্ত
পরবর্তি খবরস্কাইডাইভিং বিমানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, ফ্রান্সে নিহত ১১
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!