সিএনএন প্রতিবেদন : ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ঘোষণা, মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ভিনিউজ : মইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সহিংসতা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আটক বিক্ষোভকারীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানের বিচার বিভাগ। এ অবস্থায় একজন বিক্ষোভকারীকে আজই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানিকে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাকে আইনজীবী নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং পুনর্বিচারের আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র “কঠোর পদক্ষেপ” নিতে পারে।
নিহত ২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪০৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৮ হাজারের বেশি মানুষ। সংস্থাটি বলছে, রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ইরান সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে দাবি করা হচ্ছে, নিহতদের একটি অংশ বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘সন্ত্রাসী’ কার্যক্রমের শিকার।
টানা ষষ্ঠ দিন ইন্টারনেট বন্ধ
ইরানে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আরোপিত এই যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে। রাষ্ট্র-সংলগ্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই অবস্থা আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
আতঙ্কের মধ্যে তেহরান
তেহরানের এক বাসিন্দা সিএনএনকে জানিয়েছেন, শহরের পরিবেশ “অত্যন্ত ভারী ও ভীতিকর।” সন্ধ্যার পর এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে এবং আধা-সামরিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তিনি বলেন, ছোট পরিসরে জড়ো হলেই নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসভাবে হস্তক্ষেপ করছে।
এদিকে সিএনএন ও ইরানওয়ারের হাতে আসা এক চিকিৎসকের গোপন সাক্ষ্যে জানা গেছে, অস্থায়ী মর্গে সারি সারি লাশ রাখা হচ্ছে এবং আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরাও চরম ভয়ের মধ্যে রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে—এই আশঙ্কায় সৌদি আরব, কাতার ও ওমান কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। এসব দেশ মনে করছে, ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।
একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রবাসী ইরানিরা বিক্ষোভ করছেন। সিডনিতে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা ইরানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের আহ্বান জানান।
পাল্টা রাষ্ট্রীয় অবস্থান
এর মধ্যে তেহরানে সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহত প্রায় ১০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকের রাষ্ট্রীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এসব মৃত্যুকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল’ বলে উল্লেখ করেছে।
ইরানের পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দমন-পীড়ন ও কঠোর শাস্তির পথ অব্যাহত থাকলে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে।




