ভেনেজুয়েলা থেকে ঢাকা: ভূমিকম্পের শিক্ষা কতটা নিচ্ছি?

 

জয়ন্ত আচার্য

গত ২৫ জুন ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর বিশ্ব আবারও দেখল, কয়েক সেকেন্ডের কম্পন কীভাবে একটি দেশের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। রাজধানী কারাকাসে ভবন ধসে পড়েছে, শত শত মানুষ আহত হয়েছে, জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছে। ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকর্মীদের মরিয়া অভিযান, স্বজনহারাদের আহাজারি এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষের আর্তনাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-প্রকৃতির কাছে আধুনিক নগরসভ্যতা কতটা অসহায়।

ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। কারণ আমরা এমন এক ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে বসবাস করছি, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প কোনো কল্পনা নয়, বরং সময়ের অপেক্ষা মাত্র। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা আজ এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও আতঙ্ক ও ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। ফলে প্রশ্ন জাগে-যদি আগামীকাল ঢাকার কাছে ৭ বা ৮ মাত্রার কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে আমরা কতটা প্রস্তুত?

গত কয়েক বছরে ঢাকার আশপাশে একের পর এক ভূমিকম্প নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র ২৬ সেকেন্ডের সেই কম্পনে প্রাণহানি ঘটে, বহু ভবনে ফাটল ধরে এবং রাজধানীবাসীর মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর নরসিংদী, রূপগঞ্জ, পলাশ, শিবপুর, বাড্ডা এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেন্দ্র ছিল ঢাকার ১৫ থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো বাংলাদেশের সক্রিয় টেকটোনিক বাস্তবতার অংশ। পৃথিবীর ভূত্বক একাধিক প্লেটে বিভক্ত। বাংলাদেশ অবস্থান করছে ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মিজ প্লেটের প্রভাব অঞ্চলে। এই প্লেটগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ ও চাপের কারণে ভূগর্ভে ক্রমাগত শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। একসময় সেই শক্তি ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্তি পায়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের চারপাশে কয়েকটি শক্তিশালী ফল্ট বা চ্যুতি রেখা রয়েছে। ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোন এবং সিলেট-শ্রীমঙ্গল অঞ্চল অতীতে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প ছিল ৮.৫ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী। ১৮৯৭ সালের ডাউকি ফল্টের ভূমিকম্প ছিল প্রায় ৮.১ মাত্রার। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে হয়েছিল ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প। অর্থাৎ এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঐতিহাসিক নজির রয়েছে।

কিন্তু ঢাকার ঝুঁকি শুধু ফল্ট লাইনের কারণে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ২২ লাখ ভবন রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এর বড় একটি অংশ নির্মাণ হয়েছে বিল্ডিং কোড না মেনে। অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা যুক্ত করা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকৌশল তদারকির অভাব এবং অপরিকল্পিতভাবে ঘনবসতি গড়ে ওঠার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার প্রায় ৫৬ শতাংশ ভবন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আবার অনেক এলাকায় ভবনগুলো এমন মাটির ওপর নির্মিত, যেখানে ভূমিকম্পের সময় ‘সয়েল লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটির তরলীকরণ ঘটতে পারে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ভূমিকম্পের সময় শক্ত মাটি কাদার মতো আচরণ করতে শুরু করে এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভবন হেলে পড়ে বা ধসে যায়।

ঢাকার পূর্বাংশ, ভরাট করা জলাভূমি, পুরনো নদীখাত এবং নরম পলিমাটির অঞ্চলগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অপরদিকে রমনা, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মিরপুর, মতিঝিল বা তেজগাঁওয়ের মতো কিছু এলাকায় মধুপুরের শক্ত লাল মাটি থাকায় তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে। তবে শুধু মাটির গঠন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। যদি ভবনের কাঠামো দুর্বল হয়, তাহলে শক্ত মাটিতেও ভবন ধসে পড়তে পারে।

পুরান ঢাকা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি। এখানে অসংখ্য পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। রাস্তা সরু, জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি এবং খোলা জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। কোনো বড় ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকারী বাহিনীর প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি আহতদের হাসপাতালে নেওয়াও দুঃসাধ্য হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন বড় ভূমিকম্প থেকে আমরা একটি বিষয় স্পষ্টভাবে শিখেছি-মানুষের মৃত্যু শুধু কম্পনের কারণে হয় না; বরং দুর্বল ভবন, অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস বিস্ফোরণ, উদ্ধার বিলম্ব এবং অবকাঠামোগত বিপর্যয়ই অধিকাংশ প্রাণহানির কারণ হয়। ২০১০ সালের হাইতি ভূমিকম্পে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়ে। ২০২৩ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ার ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুর্বল নির্মাণব্যবস্থা ভূমিকম্পকে গণবিপর্যয়ে রূপ দেয়।

ঢাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, বড় ভূমিকম্প হলে একসঙ্গে কয়েক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষকদের মতে, ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আঘাত হানলে কয়েক লাখ মানুষ হতাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শহরের এক-তৃতীয়াংশ ভবন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাহলে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। ২০১৬ সালের পর রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের হালনাগাদ তথ্য নেই। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজউক, সিটি করপোরেশন ও প্রকৌশল সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রতিটি ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা মূল্যায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ভবন নিরাপত্তা সনদ চালু করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভবনকে সবুজ, হলুদ এবং লাল রঙের মাধ্যমে ঝুঁকির শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ঢাকাতেও একই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নিরাপদ ভবন সবুজ, মাঝারি ঝুঁকির ভবন হলুদ এবং বিপজ্জনক ভবন লাল চিহ্ন পাবে। এতে মানুষ নিজের ভবনের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হবে।

তৃতীয়ত, বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রকৌশল নকশা ছাড়া নির্মাণ, অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা সংযোজন এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চতুর্থত, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। অনেক ভবন সংস্কার করে নিরাপদ করা সম্ভব। যেগুলো নিরাপদ করা সম্ভব নয়, সেগুলো ধাপে ধাপে ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে।

পঞ্চমত, নগর পরিকল্পনায় খোলা জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। পার্ক, মাঠ, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান দখলমুক্ত করতে হবে। বড় দুর্যোগের সময় এসব স্থানই আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

ষষ্ঠত, নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জাপানে শিশুদের স্কুলজীবন থেকেই ভূমিকম্প মহড়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস এবং আবাসিক এলাকায় নিয়মিত মহড়া চালু করতে হবে। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না-এ বিষয়ে জনগণকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

সপ্তমত, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। ধ্বংসস্তূপ কাটার যন্ত্র, অনুসন্ধান প্রযুক্তি, ড্রোন এবং উদ্ধার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রাখতে হবে।

অষ্টমত, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভূমিকম্প সহনশীল করতে হবে। কারণ বড় ভূমিকম্পের পর অগ্নিকাণ্ড ও অবকাঠামো বিপর্যয় দ্বিতীয় বিপদ হিসেবে দেখা দেয়।

নবমত, গবেষণা ও তথ্যভাণ্ডার শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখনো সীমিত। আধুনিক সিসমিক স্টেশন বৃদ্ধি, ফল্ট ম্যাপিং এবং ভূমিকম্প ঝুঁকি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

দশমত, স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দুর্যোগের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় স্থানীয় মানুষই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

সবশেষে বলতে হয়, ভূমিকম্পকে থামানোর ক্ষমতা মানুষের নেই। কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। জাপান, চিলি কিংবা নিউজিল্যান্ড তার প্রমাণ। একই মাত্রার ভূমিকম্প এক দেশে হাজারো প্রাণ কেড়ে নেয়, অন্য দেশে তুলনামূলক কম ক্ষতি করে। পার্থক্য তৈরি করে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা।

 

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েক সেকেন্ডের কম্পন কীভাবে একটি দেশের স্বাভাবিক জীবনকে অচল করে দিতে পারে। ঢাকার জন্য এটি শুধু দূরের কোনো দেশের খবর নয়; বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন না করি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত না করি এবং জনগণকে প্রস্তুত না করি, তাহলে একটি বড় ভূমিকম্প রাজধানীকে মানবিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

আজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। কারণ ভূমিকম্প কবে হবে, তা আমরা জানি না; কিন্তু এটি যে হবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। তাই নিরাপদ, সহনশীল ও প্রস্তুত ঢাকা গড়ে তোলাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় নাগরিক দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহির স্বার্থেই এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

পূর্বের খবরতিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনের বিপ্লবী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তি খবরমুঘল আমল থেকে আজকের ঢাকা: চার শতকের মহররম, তাজিয়া মিছিল আর এক শহরের জীবন্ত ঐতিহ্যজিহাদুল ইসলাম
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!