মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: ক্রমবর্ধমান সংঘাত, বৈশ্বিক উদ্বেগ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

 

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দিন দিন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাত, আঞ্চলিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফলে পরিস্থিতি এখন এক জটিল ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক হামলা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ স্পেন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আংশিকভাবে কমিয়ে এনেছে। তেল আভিভ থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে সেখানে একজন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। স্পেনের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার তীব্র সমালোচনা করে আসছে স্পেন। এমনকি ইরানে হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি স্পেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনকে “বিরক্তিকর” বলে মন্তব্য করেছেন এবং দেশটির ওপর পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এর জবাবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, কোনো অবৈধ কাজের প্রতিক্রিয়ায় আরেকটি অবৈধ কাজ করা হলে তা মানবতার জন্য বড় বিপর্যয়ের সূচনা করে।

যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ। সাইপ্রাসে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি সাম্প্রতিক হামলায় আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে পারেন। জানা গেছে, একই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন। তার বাবা, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সেই হামলায় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন। নতুন নেতা ঘোষণার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি বা তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্যও প্রকাশিত হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই সংঘাতের প্রভাব ক্রীড়া ক্ষেত্রেও পড়তে শুরু করেছে। ইরানের ক্রীড়া ও যুবমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই ইরানের জাতীয় ফুটবল দল। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলা নিরাপদ নয়। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে দেশটির ওপর দুটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এমন অবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পরিবেশ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জরুরি তেলের মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছে। সংস্থাটির সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত বাজারকে আশ্বস্ত করার একটি পদক্ষেপ। কারণ মজুত তেল ছাড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে এতে তেলের দাম আরও দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।

এদিকে ইরান ঘোষণা করেছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের কাছে এক লিটার তেলও পৌঁছাতে দেওয়া হবে না। ইরানের সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র বলেছেন, তেহরানের নীতি এখন “আঘাতের বদলে আঘাত”। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেসব জাহাজ যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সহযোগিতা করবে, সেগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা হামলার নতুন ধাপ শুরু করেছে। কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তারা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, শত্রুর পূর্ণ পরাজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই শেষ হবে না।

অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৭টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহতও হয়েছেন। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলো এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। স্যাটেলাইট ছবিতে কয়েকটি ঘাঁটির অবকাঠামোর ক্ষতির চিত্রও দেখা গেছে।

এই যুদ্ধের কৌশল নিয়েও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা। কিন্তু সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি। ফলে এখন নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এর একটি অংশ হলো ইরানের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া এবং আরেকটি অংশ হলো অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়ে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

এই ধরনের সামরিক কৌশল ইতিমধ্যে লেবানন ও গাজায় প্রয়োগ করা হয়েছে বলে সমালোচকেরা দাবি করছেন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক হামলার পরও প্রতিপক্ষ পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। তাই ইরানের ক্ষেত্রেও একই কৌশল কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। যদি ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের দিকে গড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়ছে এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থানও ক্রমশ কঠোর হচ্ছে। যদিও কিছু কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তবু সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা এখনো স্পষ্ট নয়। বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, সামনে আরও দীর্ঘ সময় ধরে এই সংঘাত চলতে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো বিশ্বের ওপর।

পূর্বের খবরডয়েসে ভেলে প্রতিবেদন : যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ৮৪ ইরানি নাবিকের মৃতদেহ ইরান দূতাবাসে
পরবর্তি খবরবলিউড : শরীরচর্চার আগে কোন খাবার একেবারেই খাওয়া চলবে না, পরামর্শ দিলেন তমন্নার প্রশিক্ষক