ভিনিউজ ডেস্ক : ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে এবার ফ্রান্সের ‘পরমাণু ছাতা’র আওতায় যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নরওয়ে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল দেশটি এবার ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার অংশ হিসেবে ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন পারমাণবিক প্রতিরোধ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বুধবার প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখো এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে যৌথভাবে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফ্রান্সের ‘ফরোয়ার্ড নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স’ বা অগ্রবর্তী পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নরওয়ের অংশগ্রহণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি সামরিক চুক্তি নয়; বরং ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি নতুন রাজনৈতিক বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মার্কিন রাজনীতিতে পরিবর্তনের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে বলেছেন, ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রই এখনো নরওয়ের প্রধান নিরাপত্তা ভিত্তি হিসেবে থাকবে। তবে তিনি মনে করেন, ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তিনি বলেন, ইউরোপকে এখন শুধু আলাদা আলাদা দেশ হিসেবে নয়, বরং সম্মিলিতভাবে প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোও এই চুক্তিকে ইউরোপের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও স্বাধীন ও আত্মনির্ভর হতে হবে। বিশেষ করে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি।
নরওয়ের জন্য এই সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশটির সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। ফলে মস্কোর সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নরওয়ের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। যদিও নরওয়ে স্পষ্ট করেছে যে, শান্তিকালীন সময়ে তাদের ভূখণ্ডে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বা মজুদ করা হবে না। দেশটির দীর্ঘদিনের পারমাণবিক নীতিও অপরিবর্তিত থাকবে।
এর আগে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়াও ফ্রান্সের এই পারমাণবিক সুরক্ষা উদ্যোগে যুক্ত হয়েছিল। এছাড়া জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম ও গ্রিসও ফ্রান্সের উন্নত প্রতিরোধ ফোরামের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। ফলে ইউরোপে ফরাসি নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা বলয় ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হলো রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের তথ্যমতে, এই দুই দেশের প্রত্যেকের কাছেই পাঁচ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর বাইরে চীনের কাছে প্রায় ৬০০, ফ্রান্সের কাছে ২৯০ এবং ব্রিটেনের কাছে ২২৫টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
সব মিলিয়ে নরওয়ের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি যেমন ইউরোপীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা বাড়াবে, তেমনি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিতও বহন করছে।




