ভিনিউজ ডেস্ক –
ভিনিউজ : ফ্যাশন কেবল সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম নয়, কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের শক্তিশালী ভাষা। ১৯৯৪ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য ডায়না, প্রিন্সেস অব ওয়েলস সেই সত্যই প্রমাণ করেছিলেন একটি কালো পোশাকের মাধ্যমে। ইতিহাসে যা আজও পরিচিত ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ নামে।
সেদিন লন্ডনের সারপেন্টিন গ্যালারির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পৌঁছান ডায়না। কয়েক ঘণ্টা আগেই একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাঁর তৎকালীন স্বামী চার্লস তৃতীয় প্রকাশ্যে নিজের পরকীয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। বহুদিনের গুঞ্জন সত্যি হলেও ডায়না নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করেননি। বরং আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নেন।
সেই সন্ধ্যায় তাঁর পরা কালো অফ-শোল্ডার পোশাক, খোলা কাঁধ, হাঁটুর ওপর পর্যন্ত নকশা, পরিমিত গয়না ও স্বাভাবিক হাসি মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ এই পোশাকের নাম দেয় ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’। তবে এটি প্রতিহিংসার নয়, বরং নীরব মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার প্রতীক হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

অবাক করার বিষয় হলো, আলোচিত এই পোশাকটি ওই অনুষ্ঠানের জন্য নতুন করে তৈরি হয়নি। ১৯৯১ সালে গ্রিক-ব্রিটিশ ফ্যাশন ডিজাইনার ক্রিস্টিনা স্ট্যাম্বোলিয়ান ডায়নার জন্য এটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তিন বছর ধরে সেটি তাঁর ওয়ারড্রোবেই পড়ে ছিল। পরে ডিজাইনার জানান, ডায়না একটি বিশেষ উপলক্ষের জন্য পোশাকটি বানিয়েছিলেন। তবে সঠিক সময়ের অপেক্ষায় সেটি আর পরা হয়নি।
ডায়নার সাবেক বাটলার পল বারেল তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ওই দিন টেলিভিশনে চার্লসের সাক্ষাৎকার দেখার পরও ডায়না শান্ত ছিলেন। অনুষ্ঠান উপলক্ষে পোশাক বাছাইয়ের সময় তিনি একটি পোশাক হাতে নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, “এটা কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে?” পরে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন-“না, এটাই পরব।”
আরও একটি প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, সেদিন তাঁর ইতালীয় ফ্যাশন হাউস ভ্যালেনটিনোর একটি গাউন পরার কথা ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর আগেই সেই তথ্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় তিনি পরিকল্পনা বদলে বহুদিনের সংরক্ষিত কালো পোশাকটি বেছে নেন।
ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে কালো রং শোকের প্রতীক। কেউ মনে করেন, ডায়নার পোশাক নির্বাচনের পেছনে সেই প্রতীকী বার্তাও ছিল। আবার অনেকের মতে, এটি ছিল ব্যক্তিগত কষ্টকে শক্তিতে রূপ দেওয়ার এক নীরব ঘোষণা। যে ব্যাখ্যাই ধরা হোক না কেন, সেই মুহূর্তে ডায়না প্রমাণ করেছিলেন-কখনও কখনও কোনো বক্তব্য না দিয়েও নিজের অবস্থান সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রকাশ করা যায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’ ফ্যাশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত সংকটের মুখেও আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা ও সৌন্দর্য ধরে রাখার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে আজও এটি আলোচিত।
ঘটনার তিন দশকেরও বেশি সময় পরও ডায়নার সেই কালো পোশাক বিশ্বজুড়ে নারীর আত্মসম্মান, সাহস এবং নীরব প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় এটি শুধু একটি পোশাক নয়, বরং একটি বার্তা-সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব অনেক সময় শব্দে নয়, ব্যক্তিত্বের দীপ্তিতেই দেওয়া যায়।
-আনন্দ বাজার অবলম্বনে




