কৈলাস-মানস সরোবর: চার ধর্মের পবিত্র ভূমি, আজও রহস্যময় এক দুর্গম যাত্রা

বিশেষ ফিচার

আদিত্য সুমন

ভিনিউজ : একদিকে বরফে ঢাকা প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু কৈলাস পর্বত, অন্যদিকে নীলাভ জলরাশির বিশাল মানস সরোবর। চারপাশে হিমালয়ের নিস্তব্ধতা, বাতাসে অক্সিজেনের স্বল্পতা, মুহূর্তে বদলে যাওয়া আবহাওয়া আর দুর্গম পাহাড়ি পথ। সভ্যতার কোলাহল থেকে বহু দূরে অবস্থিত এই ভূখণ্ডে পৌঁছানো যেমন কঠিন, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজার বছরের বিশ্বাসও একে করে তুলেছে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় ও পবিত্র স্থান।

সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বহু মানুষের মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। প্রকৃতির এমন ভয়াবহ রূপের মধ্যেও কেন মানুষ বারবার ছুটে যান এই দুর্গম অঞ্চলে? কেন একই পর্বত ও হ্রদ চারটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র? আর কীভাবে হাজার হাজার বছর ধরে এই বিশ্বাস টিকে আছে?

কৈলাস ও মানস সরোবর দুটিই তিব্বতে, চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত। তবে ভারত ও নেপালের সীমান্তও খুব কাছেই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উচ্চতার কৈলাস এভারেস্টের চেয়ে দুই হাজার মিটারেরও বেশি নিচু। কিন্তু উচ্চতার প্রতিযোগিতায় না থেকেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বে কৈলাসের অবস্থান অনন্য।

কৈলাসের দক্ষিণে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় রয়েছে মানস সরোবর। প্রায় ৪১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই স্বাদু পানির হ্রদ এশিয়ার অন্যতম উচ্চতম মিঠা পানির হ্রদ। শীতকালে এর পানি বরফে জমে যায়। কাছেই রয়েছে রাক্ষসতাল -যার পানি লবণাক্ত। মানস সরোবর, রাক্ষসতাল ও কৈলাসকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৃহত্তর অঞ্চলটি শুধু ধর্মীয়ভাবে নয়, ভৌগোলিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই অঞ্চল থেকেই এশিয়ার চারটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎসের সম্পর্ক রয়েছে-সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণালী। ফলে হিমালয়ের জলভূগোল ও এশিয়ার সভ্যতার বিকাশের সঙ্গেও এই অঞ্চলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কৈলাসের ধর্মীয় ইতিহাস আরও বিস্ময়কর। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে ধর্মীয় উপাসনার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্ম-চারটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানুষ কৈলাসকে পবিত্র মনে করেন। তবে প্রত্যেকের বিশ্বাসের গল্প আলাদা।

হিন্দুদের কাছে কৈলাস হলো দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাস। হিন্দু পুরাণ ও ধর্মীয় সাহিত্যে কৈলাসের উল্লেখ রয়েছে। মানস সরোবরও হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। তীর্থযাত্রীরা হ্রদের তীরে পূজা ও প্রার্থনা করেন এবং এর পানিকে পবিত্র বলে মনে করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই হ্রদে স্নান আত্মিক শুদ্ধি ও পাপমুক্তির সঙ্গে যুক্ত। যদিও পরিবেশ রক্ষার কারণে বর্তমানে সরাসরি হ্রদের পানিতে নেমে স্নানের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।

বৌদ্ধদের কাছে কৈলাস পরিচিত ‘কাং রিনপোচে’ নামে—অর্থাৎ ‘তুষারের মূল্যবান রত্ন’। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের একটি অংশে কৈলাসকে পৌরাণিক মেরু পর্বত বা মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানস সরোবরের তীরেও বিভিন্ন সময়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা সাধনা ও ধর্মীয় আচার পালন করেছেন।

অন্যদিকে তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্মে কৈলাসের গুরুত্ব আরও গভীর। এই ধর্মের অনুসারীদের কাছে কৈলাস তাদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ও অন্যতম পবিত্র উপাসনাস্থল। ঐতিহাসিকভাবে বন ধর্ম ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের মধ্যে এই অঞ্চলকে ঘিরে ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাও প্রচলিত আছে।

জৈন ধর্মেও কৈলাসের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। জৈনদের বিশ্বাস, প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এই অঞ্চলে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে বিকশিত ভিন্ন ধর্মীয় ধারাগুলোর একটি বিস্ময়কর সংযোগও যেন দেখা যায় কৈলাসকে ঘিরে।

এই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় প্রকাশ কৈলাস প্রদক্ষিণে। তীর্থযাত্রীরা সাধারণত কৈলাসের চূড়ায় ওঠেন না। বরং পর্বতকে ঘিরে প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথ হেঁটে প্রদক্ষিণ করেন। হিন্দুদের কাছে এটি ‘পরিক্রমা’, তিব্বতি বৌদ্ধদের কাছে ‘কোরা’। হিন্দু ও বৌদ্ধরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রদক্ষিণ করেন। বন ও জৈন ঐতিহ্যে প্রদক্ষিণের দিক বিপরীত।

প্রায় ৫২ কিলোমিটারের এই পথ সাধারণত তিন দিনে অতিক্রম করা হয়। কোনো কোনো তিব্বতি তীর্থযাত্রী সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করতে করতে পুরো পথ পাড়ি দেন। কিন্তু এই যাত্রা নিছক ধর্মীয় আচার নয়; এটি এক কঠিন শারীরিক পরীক্ষা। প্রচণ্ড ঠান্ডা, উচ্চতার কারণে অক্সিজেনের ঘাটতি, তুষারপাত, ভূমিধস, পাথরধস এবং আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন-সবকিছু মোকাবিলা করতে হয় তীর্থযাত্রীদের।

কৈলাস-মানস সরোবরের পথে একাধিক রুট রয়েছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস ও সিকিমের নাথু লা পাস দিয়ে ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা যেতে পারেন। আর বাংলাদেশিসহ অন্যান্য বিদেশি তীর্থযাত্রীদের জন্য নেপাল হয়ে তিব্বতে প্রবেশ একটি পরিচিত পথ। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের দিকে যাত্রার জন্য প্রয়োজন চীনের ভিসা, তিব্বতে প্রবেশের বিশেষ অনুমতি এবং অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের ব্যবস্থা।

এ কারণেই কৈলাস-মানস সরোবর এখন ধর্মীয় তীর্থস্থান হওয়ার পাশাপাশি একটি বিশেষ ধরনের পর্যটনকেন্দ্রও। প্রকৃতিপ্রেমী, অভিযাত্রী ও সাংস্কৃতিক পর্যটকদের কাছে এই অঞ্চল আকর্ষণীয়। বরফে ঢাকা পর্বত, নীল হ্রদ, তিব্বতি মঠ, প্রার্থনার পতাকা এবং বিস্তীর্ণ নির্জন মালভূমি মিলে এখানে তৈরি হয়েছে এক অনন্য ভূদৃশ্য।

তবে পর্যটনের এই আকর্ষণের বিপরীতে রয়েছে প্রকৃতির ভয়ংকর বাস্তবতা। সাম্প্রতিক নেপালের বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, এই অঞ্চলের যাত্রা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বৃষ্টি নামলেই রাস্তা বিচ্ছিন্ন হতে পারে, ভূমিধসে আটকে যেতে পারে যানবাহন, আর আকস্মিক বন্যা মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে পুরো পরিস্থিতি। নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগে তীর্থযাত্রীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও সেই ঝুঁকির নির্মম স্মারক।

তবু মানুষ যায়। কেউ শিবের আবাসের সন্ধানে, কেউ নির্বাণের আকাঙ্ক্ষায়, কেউ আধ্যাত্মিক সাধনায়, আবার কেউ শুধু পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে। ধর্মের ভাষা আলাদা হলেও কৈলাসের সামনে এসে মানুষের সেই আকর্ষণ যেন একই জায়গায় মিলিত হয়।

হাজার বছরের ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস, তিব্বতি সংস্কৃতি এবং হিমালয়ের অনন্য ভূপ্রকৃতি-সব মিলিয়ে কৈলাস-মানস সরোবর কেবল একটি পর্বত ও একটি হ্রদের নাম নয়। এটি এশিয়ার বহু ধর্ম ও সভ্যতার স্মৃতিবাহী এক জীবন্ত ঐতিহ্য।

আর সেই কারণেই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম পথগুলোর একটি পেরিয়েও মানুষ বারবার ফিরে আসে কৈলাসের দিকে। বরফে ঢাকা সেই নীরব পর্বত যেন আজও মানুষকে টানে-বিশ্বাসে, ইতিহাসে, প্রকৃতির বিস্ময়ে এবং এক অজানা আধ্যাত্মিক আকর্ষণে।

পূর্বের খবরস্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ: মীর শাহে আলম
পরবর্তি খবর‘ইমরান চুরি করেনি, পাকিস্তানের স্বার্থে যা করেছে’, কেঁদে ফেললেন মিয়াঁদাদ
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!