সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে লোডশেডিং, নাকাল জনজীবন

তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। শনিবার বিকেলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের সংকটে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিল্পকারখানাতেও ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আজ বিকেল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৬৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯৫২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫১৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায় ১৬ হাজার ৩৮৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩৬২ মেগাওয়াট; ঘাটতি ৩ হাজার ২৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৭টায় ১৭ হাজার ৫৪১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৫৩১ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১০ মেগাওয়াট। রাত সাড়ে ৭টায় চাহিদা ১৭ হাজার ৫৫১ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ নেমে আসে ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াটে। তখন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৫৩২ মেগাওয়াট।

দিনের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ছিল। সকাল ও দুপুরে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা লোডশেডিং হয়েছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার চলে গেছে, আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ের বাইরেও সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস। তবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না।

পেট্রোবাংলার শনিবার রাত ৮টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২১৯ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬১ কোটি ২০ লাখ এবং এলএনজি থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ঘনফুট। কয়েক দিন আগেও এলএনজি থেকে ৭৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ ছিল। এতে দিনের বড় একটি অংশে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়। এ সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫৫ থেকে ৫৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। রাতে সামিটের টার্মিনাল চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

তবে নতুন এলএনজি কার্গো আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। আগামী ১ ও ৪ সেপ্টেম্বর দুটি কার্গো পৌঁছানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও এর আগে নির্ধারিত কয়েকটি কার্গো না আসায় গ্যাস সরবরাহে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বড়ই থেকে যাচ্ছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, পায়রা, আদানি ও মাতারবাড়ীর মতো বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। অন্যদিকে গ্যাসের সরবরাহও ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। চাহিদা অনুযায়ী তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

কয়লা-তেলেও সংকট
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। কয়লা সংকটে আদানির কেন্দ্র থেকেও ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

ঘাটতি সামাল দিতে পিডিবি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না থাকায় সব কেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। ফলে গ্যাস, কয়লা ও তেল-তিন জ্বালানির সংকটই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।

বাসাবাড়ি ও শিল্পে দ্বৈত ভোগান্তি
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে বাসাবাড়িতে ভোগান্তি বেড়েছে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেকে রাইস কুকার বা ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার করলেও লোডশেডিংয়ের কারণে সেই ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে গেলেই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। ফলে রান্না ও পরিবারের স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও গ্যাসের স্বল্প চাপের অভিযোগ রয়েছে। ভোরে সামান্য গ্যাস মিললেও সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। অনেকে বাধ্য হয়ে এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে বাড়ছে সংসারের খরচ।

শিল্পাঞ্চলেও সংকটের প্রভাব প্রকট। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও দিনের বড় একটি অংশে কারখানা চালানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে লোডশেডিং যোগ হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। অনেক স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের সংকটের কারণে জ্বালানি নিতে চালকদের অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো কঠিন। এর সঙ্গে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান দ্রুত কমানো না গেলে আগামী দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্বের খবরঢাকার যানজট নিরসনে ৭ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
পরবর্তি খবর২০২৮ থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে, যুক্ত হচ্ছে যেসব বিষয়
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!