আজ ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। ‘গুম’ শব্দটি ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম। যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ ফিরে আসতে পারে, কেউ কোনদিনই ফিরে না। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের দিন কাটে এক অনিশ্চিত বাস্তবতায়, যেখানে কোনো সমাপ্তি নেই। কেউ মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশ করতে পারেন, দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন, কবর জিয়ারত করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হয়ে আর না ফিরলে সেক্ষেত্রে স্বজনদের শোক পালনের সুযোগটুকুও থাকে না। কী নির্মম!
‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’- এই প্রতিপাদ্যে এবার পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সাত শতাধিক মানুষকে গুমের অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে ‘সৌভাগ্যবান’ কেউ কেউ পরিবারের কাছে ফিরেছেন। কিন্তু, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনও ‘নিখোঁজ’। নিখোঁজদের স্বজনরা এখনও অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন, ডুকরে কাঁদেন। সন্তানহারা মা, নিখোঁজ বাবার সন্তান, তুলে নিয়ে গেছে এমন ভাইয়ের বোন, গুম হওয়া স্বামীর স্ত্রীসহ পরিবারের জিজ্ঞাসা- স্বজনেরা কোথায়? বেঁচে আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে? মেরে ফেলা হলে মরদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছে? তাদের অনেকেরই এই প্রশ্নের জবাব হয়তো আর কোনদিনই মিলবে না।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তির স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করছে। জোরপূর্বক গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে এধরনের অপকৌশল ব্যবহার করে থাকে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারে না এবং বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, স্মরণ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়্যারেন্স’ সম্মেলনে যে আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয়, সেই সনদে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন, সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দিবসটি পালন করে।
দিবসটির মূল উদ্দেশ্য ছিল গুম নামক মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহিতার চাপ সৃষ্টি করা। ২০১১ সাল থেকেই বাংলাদেশে দিনটি পালিত হতে থাকে। বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়, কিন্তু তা তীব্রভাবে আলোচিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে গুম করে ‘আয়নাঘরে’ আটক রেখে নির্মমতার চিত্র গুম কমিশন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে গা শিউরে উঠে।
বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি সাংবাদিকদের গুমের ঘটনার চিত্র উঠে আসে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে আর খোঁজ মেলেনি।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক আবেদন দাখিল করেছেন গুমের শিকার ও ভুক্তভোগী পরিবার। কয়েকটির বিচারও শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সই করেছে বাংলাদেশ।
গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু করেছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ হচ্ছে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স। বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করার জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। গুম-অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে আটক রাখার জন্য তৈরি করেছিল গোপন বন্দিশালা। পলাতক ফ্যাসিস্ট আমলের এসব গোপন বন্দিখানা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।
দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে ৭ শতাধিক মানুষকে গুম করেছে। এটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে ‘গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ বন্ধ করতে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করছে। ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। একইসঙ্গে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’-ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকার আশা করে, উত্থাপিত বিলগুলো যথানিয়মে আইনে পরিণত হলে ভবিষ্যতে আর কেউ গুম কিংবা অপহরণের মতো মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের পথ বেছে নেবে না।
গুমের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল
গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যাক্তির শাস্তি নিশ্চিতকরণ, ভুক্তভোগী ও তাদের অধিকার সংরক্ষণ, প্রতিকার প্রদান এবং মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে।
বিলটি উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দিতে বিলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আজ রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটি নিয়ে আলোচনা হবে। দুই-একদিনের মধ্যেই সংসদীয় কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দেবে। এরপর সংসদের চলতি তৃতীয় অধিবেশনেই বিলটি পাস হবে।
গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর গুমের কারণে মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে বা পাঁচ বছর পরও ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।
‘গুম মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ’
‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি:একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়ামে গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না সে কোথায় আছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘসময় অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক স্থগিত অবস্থায় তারা সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও একঘরে হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।




