হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ইরানের, তেলের দামে লাফ

ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। আজ বৃহস্পতিবার দেওয়া ঘোষণায় বলা হয়েছে, তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ কোনো ধরনের নৌযান এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রমের চেষ্টা করলে তার ওপর গুলি চালানো হবে বলেও সতর্ক করেছে তারা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের এ ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, কোনো শান্তিচুক্তি না হলে আরও হামলা চালানো হবে।

আজ বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী রাত ২টা ৪৩ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের (অর্থাৎ, যেসব তেল বিক্রি হবে এখন কিন্তু সরবরাহ করা হবে ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে) দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৪৮ ডলার বা ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়ে ৯৪ দশমিক ৫৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বা ১ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৭৪ ডলারে ওঠে। লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ৩ ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ডাচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বিশ্লেষকেরা গ্রাহকদের উদ্দেশে পাঠানো এক নোটে বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কোনো সমঝোতা এখনো অনেক দূরের বিষয়। ফলে পারস্য উপসাগর থেকে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে কঠোরভাবে সীমিত থাকতে পারে। তাঁদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির নতুন উত্তেজনা বৃহস্পতিবার ভোরের লেনদেনে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

এরই মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার ভোর রাতের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা শুরু করে। সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে দুই পক্ষ একটি নাজুক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। সেই যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কিছুটা থেমে থাকলেও নতুন হামলার ফলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ সময়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। ইরানের কয়েক মাসব্যাপী অবরোধের কারণে এ পথ দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বুধবার জানিয়েছে, ৫ জুন শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৭২ লাখ ব্যারেল কমে ৪২ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। অথচ রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকেরা ৪০ লাখ ব্যারেল মজুত কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুতসহ মোট অপরিশোধিত তেলের মজুত ৭ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে সরবরাহ ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রকে মজুত থেকে তেল ছাড়তে হয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে।

সরবরাহ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলেছে ওপেকের উৎপাদন পরিসংখ্যানে। রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, মে মাসে ওপেকের তেল উৎপাদন দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকেও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

পূর্বের খবরবিশ্বকে সতর্ক করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব
পরবর্তি খবরমন্ত্রিসভায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!