বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : ভারত ও রাশিয়ার বন্ধুত্ব বহু দিনের। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে গড়ে ওঠা দুই দেশের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক সময়ের নানা পরিবর্তনেও অটুট রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও দিল্লি ও মস্কোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবার সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকল্প পথ তৈরির লক্ষ্যে ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। রুশ সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন জানিয়েছেন, ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা উচিত। তাঁর মতে, বসফরাস ও হরমুজ় প্রণালীর মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থলপথে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে যে কোনও কার্যকর বিকল্প রুট গ্রহণ করতে রাশিয়া প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রাশিয়ার এই প্রস্তাবের পেছনে বড় কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বসফরাস একটি গুরুত্বপূর্ণ সরু জলপথ, যা কৃষ্ণসাগরকে মারমারা সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও নানা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার কারণে হরমুজ় প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ কোনো কারণে দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে। এই বাস্তবতায় সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত স্থল ও রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার চিন্তা করছে মস্কো।
রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য রেলপথের একটি রুট তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার ভূখণ্ড পেরিয়ে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ তৈরি করার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধরনের যোগাযোগ বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া শুধু ভারতের বাজারে সরাসরি পৌঁছানোর একটি নতুন পথ পাবে না, বরং ইউরেশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভারতের গুরুত্বও এখানে অত্যন্ত বেশি। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় ভারত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছে। চীনের পর ভারত এখন রুশ তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত ও নিরাপদ পণ্য পরিবহণের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
তবে ভারত-রাশিয়া রেল যোগাযোগের ভাবনা একেবারে নতুন নয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে দীর্ঘদিন ধরেই ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর’ বা আইএনএসটিসি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে রাশিয়া। ২০০২ সালে ভারত ও ইরানের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি করে মস্কো। এই করিডরের লক্ষ্য মুম্বই থেকে ইরান হয়ে রাশিয়া এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বাজারে পণ্য পরিবহণের একটি বিকল্প পথ তৈরি করা। সেই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইরানের রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যে রেল যোগাযোগ।
কাস্পিয়ান সাগরের কাছে অবস্থিত রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যে প্রায় ১৬২ কিলোমিটার রেলপথ তৈরি হলে আইএনএসটিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মিসিং লিঙ্ক’ পূরণ হবে। এই সংযোগকে প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি সম্পন্ন হলে রাশিয়া, ইরান ও ভারতের মধ্যে পণ্য পরিবহণ আরও সহজ হতে পারে। প্রায় ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর পুরোপুরি কার্যকর হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের সময় ও ব্যয় দুটিই কমার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, পণ্য পরিবহণের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রচলিত সমুদ্রপথে যেখানে প্রায় ৩৭ দিন সময় লাগে, সেখানে এই করিডর ব্যবহার করে তা প্রায় ১৯ দিনে নামিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
এই রেল প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে এগিয়েছে রাশিয়া ও ইরান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ইরানের সঙ্গে ২০ বছরের অংশীদারি চুক্তি করে রাশ্ত-আস্তারা রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি ইউরো এবং এর পুরো অর্থায়ন করছে রাশিয়া। রুশ ইঞ্জিনিয়াররা প্রকল্পটির নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছেন। ২০২৬ সালের মধ্যে রেলপথ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করার আশাবাদ প্রকাশ করেছে ক্রেমলিন।
তবে এই বিশাল প্রকল্পের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যবর্তী ভূপ্রকৃতি কঠিন ও দুর্গম হওয়ায় সেখানে রেললাইন নির্মাণ সহজ নয়। এর পাশাপাশি ইরানের রাজনৈতিক অস্থিরতাও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ফলে পরিকল্পনা যতই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হোক, বাস্তবে পুরো করিডর চালু করতে রাশিয়া ও তার অংশীদারদের সামনে বেশ কিছু কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
তারপরও মস্কোর কাছে এই উদ্যোগ শুধু একটি রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প নয়। এটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। আর ভারতের জন্য এটি হতে পারে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইরান ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ। হরমুজ় ও বসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থল ও রেলপথে পণ্য পরিবহণের সুযোগ তৈরি হলে বদলে যেতে পারে ইউরেশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্রও। ফলে রাশিয়ার প্রস্তাবিত ভারত মহাসাগর রেল সংযোগ শেষ পর্যন্ত শুধু দুই পুরোনো বন্ধুর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন এক বিকল্প পথ তৈরির কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




