যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদনকারীদের ফিরতে হবে নিজ দেশে

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সীমিতকরণ নীতির অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড বা স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতির আবেদনে কঠোর পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নীতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অধিকাংশ গ্রিন কার্ডপ্রত্যাশী অভিবাসীকে এখন থেকে মার্কিন মুলুক ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে এবং সেখানকার মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে নতুন করে আবেদন (কনস্যুলার প্রসেসিং) করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার (২২ মে) যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা বিভাগ (ইউএসসিআইএস) এক নীতিমালায় জানায়, ‘অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ ছাড়া স্ট্যাটাস পরিবর্তনের জন্য আবেদনকারীদের অবশ্যই দেশের বাইরে থেকে কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

এতদিন পর্যন্ত যারা বিভিন্ন ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতেন, তাঁরা সেখানে অবস্থান করেই গ্রিন কার্ডের আবেদন করার সুযোগ পেতেন। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে সেই দীর্ঘদিনের আইনি ফাঁকফোকরটি বন্ধ হয়ে গেল।

ইউএসসিআইএস-এর মেমোতে বলা হয়েছে— শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী বা ট্যুরিস্ট ভিসায় থাকা ব্যক্তিদের এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

সংস্থার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আবেদনকারীরা নিজ দেশ থেকে আবেদন করলে, যারা আবেদন বাতিল হওয়ার পরও অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাঁদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর জটিলতা কমে আসবে। এটি পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও সুষ্ঠু ও দক্ষ করে তুলবে।’

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছে, ‘আমাদের দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করার দিন শেষ।’

ইউএসসিআইএস-এর মুখপাত্র জ্যাক ক্যাহলার বলেন, ‘আইনের মূল উদ্দেশ্য বজায় রেখে আমরা অভিবাসন ব্যবস্থাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনছি। এখন থেকে কেউ সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসে গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে পারবেন না, যদি না কোনো অত্যন্ত জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়। বেড়াতে আসাকে গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।’

সংকটে পড়বে লাখো অভিবাসী পরিবার

এই কঠোর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই নিয়মের ফলে অনেক অভিবাসী যারা গ্রিন কার্ডের আশায় নিজ দেশে ফিরে যাবেন, তাঁরা হয়তো আর কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত আসার সুযোগ পাবেন না। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালীন পরিবারগুলো যেভাবে একসঙ্গে থাকার সুযোগ পেত, তাও এখন বন্ধ হয়ে যাবে।

উভয় দলের (রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট) অধীনে ইউএসসিআইএস-এর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাইকেল ভালভার্দে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি নজিরবিহীন এবং এর ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ পরিবার ও নিয়োগকর্তা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন। যারা নিয়ম মেনে আইনত আবেদন করেছিলেন, তাঁরা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লেন।’

ক্যাটো ইনস্টিটিউটের অভিবাসন শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি আইনি অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে থেকে তাঁদের স্ট্যাটাস পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছেন। নতুন নিয়ম চালু হলে এদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ঝুলে থাকা আবেদনগুলোর কী হবে?

ইতিমধ্যে জমা হওয়া আবেদনগুলো এই নিয়মের আওতায় পড়বে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে ইউএসসিআইএস-এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নীতিমালাটি কার্যকর করার সঙ্গে সঙ্গে যেসব আবেদন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে বা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, সেগুলোকে হয়তো বর্তমান নিয়মেই চলতে দেওয়া হবে। বাকিদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দেশের বাইরে গিয়ে আবেদন করতে বলা হতে পারে।

এদিকে প্রশাসন মনে করছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউএসসিআইএস-এর ওপর চাপ কমবে এবং তারা মানব পাচার বা সহিংস অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ভিসা এবং নাগরিকত্ব প্রদানের মতো জরুরি কাজগুলোতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে প্রায় ৪০টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা নানা কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এ ছাড়া চলতি বছরের আরেকটি নীতিমালায় বিশ্বের ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য সব ধরনের ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি অনুযায়ী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থান করলে স্থায়ী বহিষ্কার, ভবিষ্যতে ভিসা পাওয়ার অযোগ্যতা এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে নতুন এই নিয়ম কার্যকর হলে লাখ লাখ বৈধ ও অবৈধ অভিবাসী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পূর্বের খবরপদত্যাগ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড
পরবর্তি খবরশিশুর প্রতি সহিংসতা: অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধে আওয়াজ তুলতে বললো ইউনিসেফ