চীনের ইতিহাসে মাও জেদং এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যার নাম দেশটির বিপ্লব, কমিউনিস্ট শাসন ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। একদিকে তিনি আধুনিক চীনের অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক নীতি, বিশেষ করে ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ ও ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’, চীনের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সুচনা হয় ।
অথচ জীবনের শুরুতে মাও ছিলেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ গ্রন্থাগার সহকারী। ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের শাওশান এলাকায় একটি কৃষক পরিবারে জন্ম নেন মাও জেদং। তখন চীনে চিং রাজবংশের শাসন চলছিল। দেশজুড়ে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক সংকট। ১৯১১ সালে চীনা রাজতন্ত্রের পতন এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধবাজদের আধিপত্যে চীন কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই অস্থির পরিবেশই তরুণ মাওয়ের রাজনৈতিক চিন্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব বিশেষভাবে তাঁকে আকৃষ্ট করে। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। একই সময়ে কৃষকদের দুর্দশা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন, চীনের মতো কৃষিনির্ভর সমাজে বিপ্লবের অন্যতম প্রধান শক্তি হতে পারে কৃষক শ্রেণি।

১৯২০ সালের দিকে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় মাও মার্ক্সবাদী সাহিত্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিক লি দাজাওসহ কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁদের প্রভাবে মার্ক্সবাদ ও লেনিনবাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
পরবর্তী সময়ে মাও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হয়ে ওঠেন। হুনানে কমিউনিস্ট আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯২৩ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাং বা জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে জোট গড়ে উঠলে মাওও সেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হন।
কিন্তু এই জোট বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯২৭ সালে কুওমিনতাং নেতা চিয়াং কাই-শেক কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করেন। হাজার হাজার কমিউনিস্ট ও তাঁদের সমর্থক নিহত হন। মাওয়ের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদেরও এই সহিংসতার শিকার হতে হয়। পরিস্থিতির কারণে মাও ও তাঁর অনুসারীরা চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আশ্রয় নেন এবং সেখানে নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তুলতে থাকেন।
১৯২৭ সালের নানচাং বিদ্রোহের পর কমিউনিস্টদের সশস্ত্র বাহিনী বা রেড আর্মির বিকাশ ঘটে। এরপর কুওমিনতাংয়ের সামরিক অভিযানের মুখে ১৯৩৪ সালে মাওয়ের নেতৃত্বে শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘লংমার্চ’। প্রায় ছয় হাজার মাইলের বিপজ্জনক যাত্রাপথ পেরিয়ে কমিউনিস্টরা উত্তর-পশ্চিম চীনের ইয়ানআনে পৌঁছায়। দীর্ঘ এই যাত্রায় রেড আর্মির বিপুলসংখ্যক সদস্য মারা যান। শেষ পর্যন্ত মাত্র অল্পসংখ্যক যোদ্ধা সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

ইয়ানআনে মাও কমিউনিস্টদের নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলেন। এর মধ্যেই ১৯৩৭ সালে জাপান চীনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু করলে চীনের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাং জাপানের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়। যুদ্ধ চীনের সমাজ ও রাজনীতিকে আমূল বদলে দেয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হন। এই সময় কমিউনিস্টরা গ্রামীণ এলাকায় নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কমিউনিস্ট ও জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। কুওমিনতাং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেলেও কমিউনিস্টরা গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করে। ভূমি সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে মাও জেদংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টরা জয়ী হয়।
১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন গেটে দাঁড়িয়ে মাও জেদং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। চিয়াং কাই-শেক ও কুওমিনতাং নেতৃত্ব তাইওয়ানে চলে যায়। এর মধ্য দিয়ে চীনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
ক্ষমতায় এসে মাও শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেন এবং কৃষিকে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থার অধীনে আনেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ‘মাওবাদ’ নামে পরিচিতি পায়। এটি মূলত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের চীনা বাস্তবতায় প্রয়োগের একটি নিজস্ব রূপ। তবে মাওয়ের শাসনামল শুধু বিপ্লব ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস নয়; ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাসও। ১৯৫৮ সালে তিনি ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নীতি গ্রহণ করেন। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে মানুষকে উৎপাদন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়। কিন্তু নীতিটির ব্যর্থতা, উৎপাদন সংকট ও খারাপ ফলনের সঙ্গে মিলে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এতে তিন কোটিরও বেশি মানুষ মারা যায়। এর পর মাওয়ের রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে মাও ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ শুরু করেন। পুরোনো চিন্তা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে বিপ্লবী চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেওয়া হয়। লক্ষ লক্ষ তরুণকে নিয়ে গড়ে ওঠে রেড গার্ড। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা, ভূস্বামীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ অপমান, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হন। চীনের বহু ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক নিদর্শনও ধ্বংসের মুখে পড়ে। প্রতিবেদনে এই সময় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে মাওয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও জেদং মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরও চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রভাব গভীরভাবে রয়ে যায়। বিপ্লবী নেতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা যেমন চীনকে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়, তেমনি তাঁর কিছু নীতি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সামাজিক বিপর্যয়ের স্মৃতিও তৈরি করেছে। ফলে মাও জেদংয়ের উত্তরাধিকার একই সঙ্গে বিপ্লব, রাষ্ট্রগঠন, আদর্শবাদ এবং গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির এক জটিল ইতিহাস।




