ভিনিউজ ডেস্ক: বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। কখনও রোম্যান্টিক নায়ক, কখনও রহস্যময় চরিত্র, আবার কখনও একেবারে ভিন্ন মেজাজের মানুষ-বছরের পর বছর নিজেকে নানা ভাবে ভেঙে নতুন করে পর্দায় হাজির করেছেন তিনি। তবে বয়স ৬৪ পেরিয়েও নতুন চরিত্রের সন্ধান থামেনি এই অভিনেতার। বরং তাঁর কথায়, এখনকার লড়াইটা আরও কঠিন। কারণ নতুন কিছু করার মতো চরিত্র খুঁজে পাওয়াই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
বুধবার ৬৪তম জন্মদিনে পা দিয়েছেন প্রসেনজিৎ। তার কয়েক দিন আগে আনন্দবাজার ডট কমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়জীবন, চরিত্র বাছাই এবং বাংলা সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
চরিত্র বাছাইয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই প্রসেনজিৎ বলেন, এত চরিত্র করার পর এখন তাঁকে প্রতিনিয়ত ভাবতে হয়, নতুন আর কী করা যায়। তাঁর কথায়, ‘‘সেটাই চিন্তার। এত চরিত্র করে ফেলেছি। এখন ভাবতে হয়, নতুন আর কী করব!’’ তবে নতুন চরিত্র করার আগ্রহ যে একটুও কমেনি, সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। বরং নতুন ধরনের চরিত্রের খোঁজ তাঁর ভাবনায় নিয়মিতই থাকে।

নিজেকে অভিনেতা হিসেবে বারবার ভাঙাগড়ার চেষ্টা করেছেন প্রসেনজিৎ। সাম্প্রতিক কাজেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে তাঁকে কখনও রকস্টারের ভূমিকায়, আবার কখনও চিকিৎসকের চরিত্রে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাঁর নিজের কাছে এই পরিবর্তনের পথ মোটেই সহজ নয়। বরং তিনি মনে করেন, এখন প্রতিটি নতুন চরিত্রের জন্য তাঁকে কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে।
প্রসেনজিতের ভাষায়, ‘‘খুবই কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে। সহজে আর এ রকম চরিত্র আসছে না, যা আগে করিনি। ভাঙাচোরারও তো একটা সীমা আছে। আর আলাদা কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না।’’
তিনি জানান, গত ১০-১২ বছর ধরে নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা একান্তই তাঁর নিজের। তাই কাজের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন। বছরে অন্তত দুটি ছবি এমন করতে চান, যেগুলো বাণিজ্যিকভাবে দর্শক টানবে। ‘কাকাবাবু’-র মতো ছবি সেই জায়গায় থাকতে পারে। পাশাপাশি আরও এক-দুটি ছবিতে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ খোঁজেন তিনি।
অভিনেতার যুক্তি, সব ছবিতেই যদি শুধু ‘অন্য প্রসেনজিৎ’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর পেশাগত বাস্তবতাও কঠিন হয়ে যাবে। কারণ তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে যে ধরনের চরিত্রগুলো এসেছে, তার অনেকটাই তিনি ইতিমধ্যে করে ফেলেছেন।

তবে এত চরিত্র করার পরেও সবকিছু শেষ হয়ে গেছে-এমনটা মনে করেন না প্রসেনজিৎ। তাঁর কাছে পরিচালক ও প্রযোজকেরা এখনও এমন চরিত্র নিয়ে আসেন, যেখানে নতুন কিছু করার সুযোগ থাকে। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছার কথা বলতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে ‘দ্য গডফাদার’-এর কথা উল্লেখ করেন। মার্লন ব্র্যান্ডোর অভিনীত বিখ্যাত চরিত্রের মতো কোনও চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছা তাঁর রয়েছে। অর্থাৎ, বয়স বাড়লেও অভিনয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনও প্রবল।
রোম্যান্টিক চরিত্রের ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। যে ধরনের প্রেমের ছবির জন্য একসময় তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, সেই একই ধরনের চরিত্র বারবার করতে চান না। তবে প্রেমের গল্প থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেননি। তাঁর মতে, নতুন কিছু থাকতে হবে। ‘দৃষ্টিকোণ’-এর মতো ছবিতে প্রেমের সম্পর্কের গল্প করেছেন তিনি, কিন্তু ‘অমরসঙ্গী’-র মতো পুরনো ধাঁচের প্রেমের ছবি বারবার করার কথা এখন আর ভাবেন না।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘ডাক্তার কাকু’ নিয়েও বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথা জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর কাছে ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানকার চরিত্রটিও আগের অনেক কাজের তুলনায় আলাদা।
শুধু নিজের চরিত্র বা অভিনয় নিয়েই নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছেন প্রসেনজিৎ। বাংলা সিনেমায় নতুন কিছু হচ্ছে না-সমাজের একাংশের এমন সমালোচনার কথাও তাঁর জানা। তবে তিনি মনে করেন, বাংলা চলচ্চিত্রে এখনও নানা ধরনের কাজ হচ্ছে এবং অভিনেতা-পরিচালকেরা নতুন গল্প বলার চেষ্টা করছেন।
তবে সেই কাজ আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকের পাশাপাশি যাঁরা নিয়মিত সেখানে যান না, তাঁদের কাছেও বাংলা ছবি পৌঁছে দিতে হবে। একসময় সাধারণ সিনেমা হলগুলোতে বাংলা ছবির প্রদর্শনী হাউসফুল হতো। সেই দর্শকদের আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনার উপায় নিয়েও ভাবছেন তিনি।
৬৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও তাই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের লড়াই থামেনি। বরং তাঁর কথাতেই স্পষ্ট, দীর্ঘ অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন হয়তো নিজেরই করা কাজকে অতিক্রম করে নতুন এক প্রসেনজিৎকে দর্শকের সামনে হাজির করা। আর সেই সন্ধানেই এখনও তিনি বলে চলেছেন-নতুন কী করা যায়, সেই ভাবনা প্রতিদিনই চলছে।




