ভিনিউজ ডেস্ক : জার্মানির রাজধানী বার্লিনে সমকামীদের (এলজিবিটিকিউ) বার্ষিক ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে (CSD) প্রাইড শোভাযাত্রায় ভয়াবহ হামলার ঘটনায় একজন নারী নিহত এবং অন্তত ২৯ জন আহত হয়েছেন। শনিবার (২৫ জুলাই) রাত প্রায় ১০টার দিকে টিয়ারগার্টেন পার্কসংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত এ ঘটনাকে জার্মান কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজন ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে তদন্ত করছে। হামলার পর থেকে পুরো শহরজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে এবং সম্ভাব্য হামলাকারীর সন্ধানে হেলিকপ্টার, বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি সাদা রঙের ভ্যান দ্রুতগতিতে প্রাইড শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের ভিড়ে উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নারী নিহত হন এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীরা আরও ধারণা করছেন, ভ্যান দিয়ে হামলার পর কয়েকজনের ওপর ধারালো অস্ত্র-সম্ভবত একটি মাশেটি—দিয়েও হামলা চালানো হয়েছে। তবে এই অংশের তদন্ত এখনও চলমান এবং পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য নিশ্চিত করেনি।
হামলার পরপরই সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে হামলায় ব্যবহৃত ভ্যানটি একটি পার্কে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। জার্মান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাকে ধরতে ব্যাপক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জার্মান গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে বা হামলার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কতটুকু, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন হামলাকারী আবদুল বাল্লুত নামে এক জার্মান নাগরিক, যার পারিবারিক শিকড় লেবাননে। তিনি এর আগেও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। ডোব্রিন্ট এ ঘটনাকে “সন্দেহভাজন ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, হামলার পেছনে কোনো বৃহত্তর উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হামলার পর বার্লিনজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে। এক হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টার, থার্মাল-ইমেজিং ক্যামেরা, বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিট এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য অনুকরণমূলক (কপিক্যাট) হামলার আশঙ্কায় জার্মানিজুড়ে নিরাপত্তা সতর্কতার মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।
হামলার পরপরই বার্লিন প্রাইড শোভাযাত্রা এবং এর পরবর্তী সব অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। আয়োজকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনুষ্ঠানস্থলের বড় পর্দার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের শান্তভাবে এলাকা ত্যাগের আহ্বান জানান। ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের বিশাল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, “এলাকা খালি করুন।”
ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিওতে আতঙ্কের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জরুরি সেবা কর্মীদের আহতদের দ্রুত সরিয়ে নিতে দেখা যায়। অনেককে বিশেষ থার্মাল ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কেউ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন—মুহূর্তের মধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশ রূপ নেয় শোক ও আতঙ্কে।
রোববার নিহত নারীর স্মরণে বার্লিনে শোকসভা ও মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অসংখ্য মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। এক প্রাইড অংশগ্রহণকারী বলেন, “এই হামলার পর আমাদের এই অনুষ্ঠান আর কখনও আগের মতো থাকবে না।”
ঘটনার পর গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎস। তিনি হামলাকে “ভয়াবহ একটি ঘটনা” আখ্যায়িত করে বলেন, “উগ্রপন্থীদের জার্মান সমাজে কোনো স্থান নেই। সন্ত্রাসবাদের বিষ আমাদের সমাজকে কখনও গ্রাস করতে দেওয়া হবে না।” তিনি অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন এবং জানান, ফেডারেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তিনি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।
বার্লিনের মেয়র কাই ভেগনারও এ ঘটনাকে “স্বাধীন ও উদার সমাজের ওপর সরাসরি আক্রমণ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “বার্লিন স্বাধীনতার শহর। আজ সেই স্বাধীনতার ওপর নৃশংস আঘাত হানা হয়েছে। নিহত ও আহতদের পরিবার-পরিজনের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।”
ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে (CSD) জার্মানির সবচেয়ে বড় এলজিবিটিকিউ+ অধিকারবিষয়ক আয়োজন। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্টোনওয়াল বিদ্রোহের স্মরণে প্রতিবছর এই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী এলজিবিটিকিউ+ অধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এ বছর আয়োজকরা প্রায় ১০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের আশা করেছিলেন।
হামলার উদ্দেশ্য, এতে আর কেউ জড়িত ছিল কি না এবং এটি পূর্বপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা নাকি কোনো বৃহত্তর উগ্রবাদী ষড়যন্ত্রের অংশ—এসব বিষয় এখন নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে জার্মান নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সম্পূর্ণ চিত্র সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।




