নাহিদ ইসলামকে ৩০ নেতার চিঠি : জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে ভাঙনের পথে এনসিপি

 

-শিপন হাবীব

ভিনিউজ : জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করতে গিয়ে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির সঙ্গে এনসিপির সমঝোতায় আপত্তি জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে দলের কেন্দ্রীয় ৩০ নেতা চিঠি দিয়েছেন। জানা গেছে, এ ঘটনায় এনসিপির মধ্যে তোলপাড় চলছে। আজকালের মধ্যে দলটির আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। এমন পরিস্থিতি হলে এনসিপিতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে।

ইতোমধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় পদত্যাগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। এছাড়া যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা দল থেকে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে আর একটু এগোলেই পদত্যাগের হিড়িক পড়বে।

নব গঠিত এনসিপি নির্বাচনি জোট করার জন্য বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী-দুদলের সঙ্গেই দফায় দফায় আলোচনা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা হয়নি। তবে এক সপ্তাহ ধরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটি আসন সমঝোতায় দফায় দফায় বৈঠকে মিলিত হয়ে আসন সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা করে। তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার রাতে জামায়াত-এনসিপি জোট গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। শনিবার দিনভর এ নিয়ে এনসিপির ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। এমন সংবাদের পরপরই দলটির মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। গত দুই দিন থেকেই এ বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। জানা যায়, এনসিপিকে ৩০টি আসন ছেড়ে দিচ্ছে জামায়াত। নতুন এ দলটি আসন চেয়েছিল ৫৬টি।

এদিকে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট চূড়ান্ত এমন সংবাদের পরপরই শনিবার সন্ধ্যায় দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে ঢাকা-৯ আসনে এনসিপি থেকে নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দেন। এর পরপরই জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট হচ্ছে বলে আপত্তি জানিয়ে দলটির ৩০ নেতা আহ্বায়ক নাহিদ হোসেনের কাছে চিঠি দেন। চিঠিতে জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে চরম আপত্তি জানানো হয়।

শনিবার সন্ধ্যায় দলের যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করে যুগান্তরকে জানান, এনসিপির কেন্দ্রীয় ৩০ নেতা গুরুত্বপূর্ণ এই নীতিগত বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে নেতারা তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসাবে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার কথা তুলে ধরেন।

চিঠিতে নাহিদকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যান্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটাজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টা, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) এবং পরে ছাত্রশক্তি বিষয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার, তাদের অনলাইন ফোর্সের মাধ্যমে এনসিপি ও দলটির ছাত্র সংগঠনের নারী সদস্যদের চরিত্র হননের চেষ্টা এবং সর্বোপরি; ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে।’

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।’ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে বলে চিঠিতে নেতারা উল্লেখ করেন। ৩০ নেতা বলেন, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

চিঠিতে নেতারা আরও বলেন, এর আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একাধিকবার ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১ হাজার ৮০০ মনোনয়নপত্র বিক্রি করে ১২৫ জন প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এখন অল্প কিছু আসনের জন্য কোনো জোটে যাওয়া জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে তারা মনে করছেন।

চিঠিতে এনসিপির নেতারা আরও বলেছেন, ‘আমরা অত্যন্ত আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করেছি, যখনই এই জোটের সম্ভাবনার খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে এসেছে, এর পরপরই আমাদের সমর্থনে থাকা কর্মী-সংগঠকসহ একটা বড়সংখ্যক মানুষ আমাদের দলের প্রতি তাদের সমর্থন সরিয়ে নিতে উদ্যত হয়েছেন। যদি আমাদের সমর্থন করা মধ্যপন্থি এবং নতুন রাজনীতি প্রত্যাশা করা মানুষরা সমর্থন সরিয়ে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পার্টির মধ্যপন্থি সমর্থক ভিত্তি হারাব।’

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে কৌশল নির্ধারিত হওয়া উচিত, কৌশলগত কারণে নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মো. মুরসালীন, সংগঠক রফিকুল ইসলাম আইনী প্রমুখ।

এদিকে শনিবার বিকালে এনসিপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ‘জোট গঠনে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই সম্পৃক্ত নন। সাধারণ মানুষ হয়তো জানেন না, জেনে থাকা উচিত যে, জোট গঠনে নাহিদ ইসলাম ও পাটওয়ারীই জানেন। এই দুজন জোট মিটিংয়ে থাকেন, তারাই নেতা। আমরা জামায়াতের সঙ্গে কখনো যাব না। জোট হলে অনেক শীর্ষ নেতাই পদত্যাগ করবে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নীতি ও আদর্শের পার্থক্য রয়েছে, ফলে জোট হলে প্রকাশ্যেই সব বলা হবে। জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করার জন্য বাংলাদেশে আমাদের জন্ম হয়নি। জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে দলের শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়বে।

এনসিপির শীর্ষ এ নেতা আরও বলেন, ‘যখনই জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের ঘোষণা আসবে, সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ করব। পদত্যাগ করেই সবার জন্য সব কিছু ওপেনভাবেই বলব। এখন চুপ করে আছি। আমরা শেষ পর্যন্ত আশা করছিলাম পার্টির (এনসিপি) টনক নড়বে। তারা সঠিক পথে ফেরত আসবে। যেদিন জোটের ঘোষণা হবে-সেদিন থেকে মিডিয়াও আমাদের নিয়মিত পাবে।’

এ প্রসঙ্গে শনিবার সন্ধ্যায় এনসিপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘জামায়াত-এনসিপি জোট হবে এমনটা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু গত ১ সপ্তাহে দল দুটির মধ্যে আলোচনা-বৈঠক, এক প্রকার দিন-রাতই চলছিল। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে আসন ভাগাভাগির বিষয়টি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রবার রাতেই আসন ভাগাভাগির বিষয়টি এক প্রকার চূড়ান্ত হয়। জামায়াত এনসিপিকে ৩০টি আসন ছেড়ে দিচ্ছে। জোটের ঘোষণাটি আজকের মধ্যেই আসবে।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির অপর এক শীর্ষ নেতা প্রশ্ন তুলে যুগান্তরকে বলেন, ‘জুলাইয়ের অন্যতম নেতা সাবেক ছাত্র দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের তুলনায়ও কী তারা বড় নেতা, এখন যারা জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনে রাতদিন ব্যাকুল হয়ে পড়ছেন? ওই নেতা বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের ওই দুই নেতা কেন এখনো পর্যন্ত এনসিপিতে যোগ দেননি? তিনি বলেন, এনসিপি কোনদিকে হাঁটছে, কোনদিকে যাচ্ছে তা সাবেক ওই দুই উপদেষ্টাই জানেন।

এদিকে এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে-তখনই দলটির একটি বড় অংশের নেতারা ভুল পথে হাঁটছে-এমনটা উল্লেখ করে দলটি থেকে পদত্যাগ করেছেন বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় গেলে দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আরও কেউ কেউ পদত্যাগ করতে পারেন বলে দলের ভেতরেই আওয়াজ উঠছে। তারা বলছেন, সমঝোতার বিষয়ে দলের মধ্যে কোনো ঐক্য না থাকা সত্ত্বেও এনসিপি কেন জামায়াতের সঙ্গে জোট করছে? তারা বলেন, জোট হলেই এনসিপি ভাঙবে।

বৃহস্পতিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হতে যাচ্ছে। এনসিপি অবশেষে জামায়াতের সঙ্গেই সরাসরি জোট বাঁধছে। সারা দেশে মানুষের, নেতাকর্মীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে গুটিকয়েক নেতার স্বার্থ হাসিল করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আর এর মধ্য দিয়ে কার্যত এনসিপি জামায়াতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।’

এদিকে ফেসবুক পোস্টে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে নির্বাচনি জোট হওয়ার আভাস দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ। তিনি লেখেন, ৩০ আসনে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেলে ব্যাপারটা ‘আত্মঘাতী’ হবে।
-যুগান্তর

পূর্বের খবর২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন জুবায়ের রহমান চৌধুরী
পরবর্তি খবরএবার এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন তাজনুভা জাবীন