জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, অর্থনীতি ও জনজীবনে বহুমুখী চাপ

দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যেই জনজীবন ও অর্থনীতির প্রায় সব খাতে পড়তে শুরু করেছে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সংঘাত এবং ইরান-কে ঘিরে উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে দেশীয় বাজারে তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

নতুন মূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর প্রধান তিনটি ভিত্তি।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরপরই গণপরিবহণ ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে শিগগিরই ভাড়া সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংসহ বিভিন্ন পরিবহণ খাতে ভাড়া বাড়ার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এদিকে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কয়েক দিনের মধ্যেই বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। এতে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ভোগান্তি বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে। তারা সতর্ক করে বলেন, অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন এ সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

শিল্প খাতে এর প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল ও সিরামিকসহ প্রায় সব শিল্পই জ্বালানিনির্ভর। তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ ও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি খাতেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে। তেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বা লোডশেডিং বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি তহবিলের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে আইএমএফ-এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভর্তুকি কমানোর আন্তর্জাতিক চাপও এ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

সার্বিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

পূর্বের খবরকালিহাতীতে মেধা পুরস্কার ও অভিভাবক সমাবেশ
পরবর্তি খবরআজ থেকে দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!