জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: কৃষি, শিল্প ও বাজারে বাড়ছে বহুমাত্রিক চাপ

 

তানজিনা হাসান মৌ

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনি্উজ : মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানি নির্ভর দেশ বাংলাদেশে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করে বাড়িয়েছে, যা ইতোমধ্যে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

নতুন নির্ধারিত দামে অকটেন প্রতি লিটার ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়েছে পরিবহন খাতে। দেশের পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়ক পথ নির্ভর হওয়ায় ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

কৃষিখাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। দেশে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের প্রায় ২০ শতাংশ কৃষিকাজে, বিশেষ করে সেচের জন্য ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বোরো মৌসুমে সেচের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। কৃষকদের ভাষ্য, জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে গেছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা বলছেন, এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে না পারলে শেষ পর্যন্ত ফসলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না। এতে করে চালসহ প্রধান খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।

শিল্প খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি ডিজেল নির্ভর জেনারেটর ব্যবহার করে থাকে। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই বর্তাচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলেই ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরপরই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এর দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজিতে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা বৃদ্ধির ফলে গৃহস্থালি ব্যয় আরও বেড়েছে। শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এ কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে, যা বাস্তবায়িত হলে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং মার্চে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। নতুন করে জ্বালানিনির্ভর খরচ বৃদ্ধি পেলে এই হার আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হয়।

সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং ভর্তুকির চাপ কমাতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর অর্থনীতিতে একটি ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে, যা অন্যান্য খাতেও মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি না থাকলে এই মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো হতে পারে। ইতোমধ্যে চাল, সবজি, মুরগি ও ভোজ্যতেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ভোক্তারা বলছেন, গত এক মাসে প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে।

সার্বিকভাবে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমালেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং মুদ্রার সম্ভাব্য অবমূল্যায়ন-সব মিলিয়ে একটি চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দেশ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর নীতি গ্রহণ, বাজার তদারকি জোরদার এবং ভোক্তাবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ এখন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পূর্বের খবরসংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণা
পরবর্তি খবরপজেটিভ বাংলাদেশ : ১৯ দিনেই দুই বিলিয়ন ডলার ছাড়াল রেমিট্যান্স