ভিনিউজ ডেস্ক:
লেবানন দাবি করেছে, দেশটির প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রস্তাব অনুযায়ী ইসরায়েলও লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ওপর হামলা বন্ধ করবে বলে জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত লেবানন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “পারস্পরিক হামলা বন্ধের” মার্কিন প্রস্তাব হেজবুল্লাহ গ্রহণ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সমঝোতার আওতায় বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হবে এবং এর বিপরীতে হেজবুল্লাহও ইসরায়েলের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে। পরবর্তীতে এই যুদ্ধবিরতি পুরো লেবাননে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হেজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলি শহর ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে বৈরুতের ওপর ইসরায়েলি অভিযানও চলবে। একই সময়ে তিনি জানান, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) নির্ধারিত সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি নেতানিয়াহু এবং হেজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং উভয় পক্ষ সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধে সম্মত হয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একাধিক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, বৈরুতে নতুন কোনো সামরিক অভিযান পরিচালিত হবে না এবং সেখানে পাঠানো কিছু সেনাকেও ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও কিছু সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। হেজবুল্লাহ জানিয়েছে, উত্তর ইসরায়েলের দুটি গ্রামের কাছে ইসরায়েলি ট্যাংক ও সেনাদের লক্ষ্য করে তারা ড্রোন এবং কামানের গোলা ব্যবহার করে তিনটি হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, লেবানন থেকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। ডেব্বিন শহরে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানানো হয়।
এদিকে, ইরান এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তা লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব সংঘাতপূর্ণ এলাকার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তার ভাষায়, “একটি এলাকায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন মানে সব এলাকায় তা লঙ্ঘন করা।”
ইরানের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ আলোচনা স্থগিত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোতেও ইরান ও তার মিত্ররা সক্রিয় হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বাইরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হেজবুল্লাহকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসা ইরানের প্রভাবের কারণে এই দুই ইস্যুকে পুরোপুরি আলাদা রাখা কঠিন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৭ ডলারে পৌঁছে যায়। যদিও পরে কিছুটা কমে আসে, তবুও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাজারকে অস্থির করে রেখেছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হবে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
-বিবিসি




