ঈদের পর নতুন সরকারের সামনে তিন বড় চ্যালেঞ্জ: দৃঢ় পরিকল্পনাই হতে পারে উত্তরণের পথ

 

মন্তব্য প্রতিবেদন

জয়ন্ত আচার্য

ঈদের আনন্দঘন ছুটি শেষ হতে চলেছে। ছুটির আমেজ কাটিয়ে সরকারি অফিস-আদালত খুলবে, কর্মচাঞ্চল্যে ফিরবে দেশ। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছাড়া এবারের ঈদ মোটের উপর ছিল আনন্দময়। এই সময়ের মধ্যেই কেটে গেছে নতুন সরকারের প্রথম এক মাস। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী “ফ্যামিলি কার্ড” ও “খালকাটা কর্মসূচি” চালু করে সরকার ইতোমধ্যে জনমনে কিছুটা ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সামনে যে পথ, তা মোটেও সহজ নয়। বরং ঈদের পরই অপেক্ষা করছে তিনটি বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জ-জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা।

প্রথমত, জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। ইতোমধ্যেই জ্বালানি নিয়ে কিছুটা চাপ অনুভব করেছে সাধারণ মানুষ। সামনে গ্রীষ্মকাল-এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। একই সঙ্গে বোরো মৌসুমে কৃষিতে সেচের জন্য বাড়তি জ্বালানি প্রয়োজন হবে। ফলে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য কেবল আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস অনুসন্ধান ও জ্বালানি মিশ্রণ বৈচিত্র্যকরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি কৃষি, শিল্প ও পরিবহন-সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের জন্য আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি নানা চাপে রয়েছে-উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এক্ষেত্রে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যাতে রাজস্ব ঘাটতি আরও বেড়ে না যায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো-যেমন ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি সহায়তা,সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাও এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়, আর কর্মসংস্থান ছাড়া অর্থনীতির গতিশীলতা ফেরানোও কঠিন। এজন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, নীতি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা না গেলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘায়িত হতে পারে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক মাঠ পুরোপুরি শান্ত নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকি, ৫ আগষ্ট পরিবর্তি মামলা -সব মিলিয়ে একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে প্রশাসনে দলীয়করণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা সরকারকে চাপে ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হবে সংলাপের পথ খোলা রাখা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। শক্তি প্রয়োগের বদলে সমঝোতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারলেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে, ঈদের পর নতুন সরকারের সামনে যে তিনটি চ্যালেঞ্জ-জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য-তা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি খাতে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য খাতেও পড়বে। তাই বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

সরকারের প্রথম এক মাসে নেওয়া কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আশা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। এজন্য দরকার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-জবাবদিহিতা। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি, আর সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে এই সরকারের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা এবং বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা-এই তিনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই নতুন সরকার সামনের কঠিন সময় পার করে একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক : ভিনিউজ সম্পাদক ও গবেষক

পূর্বের খবরউত্তেজনার মধ্যে আরব সাগরে ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিন
পরবর্তি খবরজন্ম দিনে প্রসেনজিৎ : রানি যেন সারা জীবন মহরানী হয়ে থাকে
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!