ইসরায়েলের সঙ্গে গ্রিসের ৩ বিলিয়ন ইউরোর অস্ত্রচুক্তি: বদলে যাচ্ছে ভূমধ্যসাগরের সামরিক সমীকরণ?
আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
ভিনিউজ :পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামরিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিল গ্রিস। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এথেন্স। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে এই চুক্তির আওতায় গ্রিসের জন্য গড়ে তোলা হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বহুস্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা অন্য কোনো আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এই প্রতিরক্ষা কাঠামো গ্রিসের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্রিস কেন হঠাৎ ইসরায়েলের কাছ থেকে এত বড় পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কিনছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু গ্রিসের সামরিক আধুনিকায়ন নয়, তুরস্ককে ঘিরে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের পরিবর্তিত ভূরাজনীতির দিকেও তাকাতে হয়।
তেল আবিবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে চুক্তিতে সই করেন দুই দেশের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা। গ্রিসের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই চুক্তি করা হয়েছে। ২০৩৬ সালের মধ্যে নিজেদের সামরিক বাহিনী আধুনিক করতে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে গ্রিস। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্স ও ইতালির কাছ থেকে যুদ্ধজাহাজ কেনার পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষাকেও আধুনিক করা হচ্ছে। অর্থাৎ এথেন্স একই সঙ্গে আকাশ, সমুদ্র ও স্থল—তিন ক্ষেত্রেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা নতুন করে সাজাচ্ছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এর প্রযুক্তিগত পরিধির কারণে। এর আওতায় রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের ‘ডেভিডস স্লিং’ ও ‘স্পাইডার’ এবং ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের ‘বারাক এমএক্স’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রিসে যুক্ত হবে। বর্তমানে গ্রিসের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট, রাশিয়ার এস-৩০০সহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন ইসরায়েলি ব্যবস্থাগুলো এসবের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করবে। আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন অনেক দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে গ্রিসের এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের পেছনে তুরস্কের বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গ্রিস ও তুরস্ক—দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য হলেও এজিয়ান সাগর, দ্বীপপুঞ্জ, আকাশসীমা, সমুদ্রসীমা এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি সম্পদ নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীকে দ্রুত শক্তিশালী করেছে। ফলে গ্রিসও পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। এথেন্সের দৃষ্টিতে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা শুধু সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নয়, বরং তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতার মোকাবিলায় একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুরস্কের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের বিস্তার। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। যাকে অনেকেই ‘মক্কা প্যাক্ট’ নামে অভিহিত করছেন, সেটি এখনো গ্রিসবিরোধী কোনো সামরিক জোট নয়। তাই এই চুক্তিকে ভয় পেয়েই গ্রিস ইসরায়েল থেকে অস্ত্র কিনছে-এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে তুরস্ক যদি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ায়, তাহলে এথেন্সের কৌশলগত হিসাব যে আরও জটিল হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অন্যদিকে তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার সামরিক যোগাযোগও দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে একদিকে তুরস্ক–পাকিস্তান–সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অন্যদিকে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব-সব মিলিয়ে একক কোনো জোটের বদলে তৈরি হচ্ছে একাধিক সামরিক অংশীদারিত্বের জাল।
এই বাস্তবতায় গ্রিসের ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা কেনা কেবল অস্ত্র কেনাবেচার ঘটনা নয়। ইসরায়েলও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির সময়ে গ্রিসের মতো একটি ন্যাটো সদস্য দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ইসরায়েলি প্রযুক্তি দিয়ে গ্রিসকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বও আরও দৃঢ় হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গ্রিস যদি আকাশ প্রতিরক্ষা, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজে বড় বিনিয়োগ করে, তুরস্কও তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে। আর তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সামরিক সহযোগিতা এবং ভারতের পাল্টা সামরিক আধুনিকায়ন—এই প্রবণতাগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বিশ্বজুড়ে পুরোনো দুই-মেরুর রাজনীতির বদলে এখন তৈরি হচ্ছে বহুস্তরীয় ও বহু-কেন্দ্রিক সামরিক সমীকরণ। গ্রিসের ইসরায়েলি অস্ত্র কেনা সেই পরিবর্তনেরই পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।




