ভিনিউজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে উপহার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক বাল্ড ঈগলের একটি বড় ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। ওয়াশিংটনে জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে শি ও তাঁর স্ত্রীকে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। অনুষ্ঠানে উন্মোচিত এই উপহারকে কেবল সৌজন্য বিনিময় হিসেবে দেখছেন না কূটনীতি বিশ্লেষকেরা; বরং বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বৃহত্তর প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ঈগলের ভাস্কর্যটির নকশা তৈরির কাজে তিনি এবং মেলানিয়া অংশ নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, মূর্তিটি ‘আমেরিকার স্বাধীন ও ঊর্ধ্বগামী চেতনার’ প্রতীক। উত্তর আমেরিকার স্থানীয় পাখি বাল্ড ঈগল ১৭৮২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে চীনের প্রেসিডেন্টকে এই প্রতীক উপহার দেওয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ও শক্তির একটি প্রতীকী বার্তাও রয়েছে।
তবে কূটনীতিতে উপহারের অর্থ সব সময় সরাসরি বোঝা যায় না। রাষ্ট্রীয় উপহার অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনীতিক ড্যানিয়েল ক্রিটেনব্রিঙ্কের মতে, ট্রাম্প ও শির মতো নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি নিয়ে যতই মতবিরোধ থাকুক, নেতাদের সরাসরি সম্পর্ক অনেক সময় জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এই মুহূর্তে ট্রাম্প ও শির সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর এটি তাঁদের তৃতীয় সরাসরি বৈঠক। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমলেও বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, আনুষ্ঠানিকতা এবং উপহার বিনিময়কে সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর দৃশ্যমান কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চীনও পাল্টা উপহারের মাধ্যমে নিজেদের বার্তা দিয়েছে। শি জিনপিং ঘোষণা করেছেন, আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানায় দুটি জায়ান্ট পান্ডা পাঠাবে চীন। পাশাপাশি নতুন একটি শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির কথাও জানিয়েছেন তিনি। এর আওতায় আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ মার্কিন শিক্ষার্থীর চীনে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। শি পান্ডাকে চীনা ও মার্কিন জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের ‘দূত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে উপহার বিনিময়ের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০১৩ সালে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় রেডউড কাঠ দিয়ে তৈরি একটি খোদাই করা বেঞ্চ উপহার দিয়েছিলেন। তাঁদের সাক্ষাতের স্থানকে স্মরণীয় করে রাখাই ছিল ওই উপহারের মূল তাৎপর্য। বিপরীতে, ২০০৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ওবামাকে একটি ঐতিহাসিক দাসবিরোধী জাহাজের কাঠ দিয়ে তৈরি শোভাবর্ধক পেন হোল্ডার উপহার দিয়েছিলেন। ওবামার দেওয়া কয়েকটি ডিভিডি যুক্তরাজ্যের ডিভিডি প্লেয়ারে ব্যবহার করা যায়নি বলে ওই বিনিময় পরে কূটনৈতিক উপহার ব্যবস্থাপনার একটি বিব্রতকর উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

রাষ্ট্রীয় উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য নানা নিয়ম ও বিধিনিষেধ রয়েছে। বিদেশি সরকারের কাছ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কত মূল্যের উপহার গ্রহণ করতে পারবেন, তা নিয়ে আইন ও প্রটোকল রয়েছে। নির্ধারিত সীমার বেশি মূল্যের উপহার সাধারণত ফেডারেল সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়, যদি প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে তার মূল্য পরিশোধ না করেন। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উপহার নির্বাচন, মূল্য নির্ধারণ, বিনিময়ের সময় ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আগে থেকেই দীর্ঘ প্রস্তুতি চলে।
শি জিনপিংকে দেওয়া ঈগলের ভাস্কর্য তাই নিছক একটি স্মারক উপহার নয়। একদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক ও স্বাধীনতার বার্তা বহন করছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনীতি ও নেতা-পর্যায়ের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। একই সময়ে চীনের পান্ডা ও শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির ঘোষণা দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বার্তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও মতবিরোধ যতই গভীর হোক, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতা, উপহার বিনিময় এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মধ্য দিয়ে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট-দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে না দেওয়ার জন্য কূটনীতিতে প্রতীকী বার্তাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




