বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : ভারতের রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক জোট ‘ইন্ডিয়া’র বিশাল সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বিরোধীদের এই শক্তি প্রদর্শনের পাল্টা জবাব দিতে রোববার (১ নভেম্বর) দেশজুড়ে রাজপথে নামে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ‘লোকতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ স্লোগানে একাধিক রাজ্যে মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে দলটি। বিজেপির মূল আক্রমণের লক্ষ্য ছিল কংগ্রেস এবং বিরোধী জোটের নির্বাচন কমিশনবিরোধী আন্দোলন। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রসঙ্গ সামনে এনে কংগ্রেসকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা।
চণ্ডীগড়ের এক জনসভায় অমিত শাহ লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের দিল্লির বাসভবনে বিরোধী জোটের আয়োজিত প্রতীকী সংসদ বা ‘ছদ্ম সংসদ’-এর প্রসঙ্গ টেনে শাহ বলেন, রাহুল গান্ধী যদি প্রধানমন্ত্রী হতে চান, তাহলে তাঁকে বাকি জীবন এমন ছদ্ম সংসদেই কাটাতে হবে। বাস্তব রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তাঁর আর আসবে না। কংগ্রেসের ধারাবাহিক নির্বাচনী পরাজয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সোনিয়া গান্ধীর ছেলেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার স্বপ্ন কোনো দিন পূরণ হবে না।

তবে অমিত শাহের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর দেশজুড়ে সংঘটিত শিখবিরোধী হত্যাযজ্ঞ। শাহ দিনটিকে গণহত্যার কালো অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে কংগ্রেস রাজনৈতিক সমাবেশের আয়োজন করে শিখ সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ক্ষতকে অসম্মান করেছে। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস মিথ্যাচার, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করার রাজনীতি করছে। বিজেপির অন্যান্য নেতারাও এই প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
দিল্লির পশ্চিমাঞ্চলের হরিনগরে বিজেপির পাল্টা মিছিলে নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত এবং দিল্লি বিজেপির নেতারা। একই সময়ে হরিয়ানার রোহতকসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির কর্মসূচি পালিত হয়। হিমাচল প্রদেশের শিমলাতেও বিরোধীদের সমাবেশের প্রতিবাদে সরব হন বিজেপি নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এনে বিরোধীরা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করছে।
অন্যদিকে, রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের সমাবেশে জনসমাগম ছিল ব্যাপক। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বিরোধী নেতাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য হুমকি।

সমাবেশে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উদ্দেশ করে বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের পর এবার তাঁদের লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোটি কোটি ভোটারের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি ও তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী জোটের নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
ভারতের রাজনীতিতে এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি কেবল একটি দিনের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার ঐতিহাসিক দায় নিয়ে দুই শিবিরের মুখোমুখি অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। বিরোধীরা যেখানে ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রশ্নে আন্দোলন জোরদার করতে চাইছে, সেখানে বিজেপি কংগ্রেসের অতীতের রাজনৈতিক দায় সামনে এনে বিরোধীদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে। ফলে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।




