ভিনিউজ ডেস্ক : ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ভবিষ্যতের ভারত গড়ার লক্ষ্যে একগুচ্ছ বার্তা দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে ‘বিকশিত দেশ’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অর্থনীতি, উৎপাদন, কৃষি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং সংস্কৃতিকে সামনে রেখে ‘শক্তির সপ্তধারা’র কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু বিশ্বের বড় বাজার হিসেবে নয়, ভারতকে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদন ও সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাঁর সরকার।
মোদীর ঘোষিত সপ্তধারার প্রথমটি হলো উৎপাদন শক্তি। ডিজাইন থেকে যন্ত্রাংশ তৈরি-প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বিশ্বের দেশগুলো যখন নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন ভারত শুধু ভোক্তা বা বাজার হয়ে থাকতে পারে না; বরং ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যকে বিশ্বের বাজারে পৌঁছে দিয়ে ভারতকে বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ। বাজরা, মশলা, ফলমূলসহ কৃষিপণ্যে রাসায়নিকমুক্ত চাষাবাদ থেকে শুরু করে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং রফতানি পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতের কৃষিপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
তৃতীয় স্তম্ভ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন। ভারতকে শুধু প্রযুক্তির বাজার নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মতো ক্ষেত্রে বিশ্বের উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন মোদী। একই সঙ্গে আগামী দিনে দেশজুড়ে ভারতের তৈরি ৬জি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি। তরুণ প্রজন্মকে এআই-সহ আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থ শক্তি হলো গতিশক্তি বা দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা। শহর, রেলপথ, বিমানবন্দর এবং আধুনিক সমুদ্রবন্দরকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন বহুমুখী লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর ফলে পণ্য পরিবহণের সময় ও খরচ কমিয়ে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য রয়েছে।
পঞ্চম ক্ষেত্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা শক্তি। ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা, হাইপারসনিক প্রযুক্তিসহ পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে দেশীয় উদ্ভাবন বাড়ানোর বার্তা দিয়েছেন মোদী। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার পাশাপাশি ভারতীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জামকে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
ষষ্ঠ শক্তি গ্রিন ও ব্লু অর্থনীতি। গ্রিন হাইড্রোজেন, শক্তি সঞ্চয় এবং পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সমুদ্র, উপকূলীয় অঞ্চল ও সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্লু ইকোনমির বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা স্পষ্ট করেছেন।
সপ্তম শক্তি হলো ভারতের সফট পাওয়ার। যোগ, আয়ুর্বেদ, ভারতীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি গেমিং, ভিএফএক্স, অ্যানিমেশন ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে ভারতকে নেতৃত্বের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য তুলে ধরেছেন মোদী। সামরিক শক্তির বাইরে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মাধ্যমেও বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ভবিষ্যতের ভারতের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছবিও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর লক্ষ্য, ‘ফরচুন ৫০০’ তালিকায় অন্তত ৫০টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান থাকবে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভারতীয় ব্যাংক, বিশ্বের সেরা পাঁচ ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত একটি ভারতীয় কোম্পানি এবং শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ভারতীয় সংস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভারতীয় আইন, রেটিং, কনসাল্টিং ও অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নও দেখিয়েছেন তিনি।
২০২২ সালে ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ‘পাঁচ প্রতিজ্ঞা’র কথা বলেছিলেন মোদী। চার বছর পর ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে তাঁর নতুন বার্তা ‘শক্তির সপ্তধারা’কে সামনে রেখে ২০৪৭-এর বিকশিত ভারতের পথে এগিয়ে যাওয়া। উৎপাদন থেকে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা থেকে পরিবেশ এবং অর্থনীতি থেকে সংস্কৃতি-সব ক্ষেত্রকে একসঙ্গে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের ভারতকে বিশ্বমঞ্চে আরও প্রভাবশালী করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী ।




