দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এটাই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেখানে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন দুজন। ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী। মুক্তিযুদ্ধে বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা অলি আহমদ একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদকক্ষে চলবে ভোটগ্রহণ। মোট ভোটার ৩৪৯ জন। তবে আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল ঘোষণা না হওয়ায় একজন সংসদ সদস্য ভোটার তালিকায় নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। ফলে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদ অধিবেশন না থাকায় এ উপলক্ষে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোট হবে প্রচলিত গোপন ব্যালটে নয়। সংসদ সদস্যরা ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজের সম্পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন এবং নিজ আসনেই ভোট দেবেন। প্রার্থী মির্জা ফখরুল সংসদ সদস্য হওয়ায় ভোট দিতে পারবেন; তবে সংসদ সদস্য না হওয়ায় অলি আহমদ ভোট দিতে পারবেন না।
ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা করা হবে। পরে ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৯১ সালের পর এবারই বড় ব্যতিক্রম
১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার পর সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেন। বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট, আর চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। মোট ৩৩০ ভোটারের মধ্যে সেদিন ভোট দিয়েছিলেন ২৬৪ জন।
এরপর আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী এককভাবে থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটা?
সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মূলত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর পর নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত হয়।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ভূমিকা রয়েছে। অন্য অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
সংসদ আহ্বান, সংসদ স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, বিলে সম্মতি, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর।
তবে রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির পদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়ে একাধিকবার আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে।
ফলে রাষ্ট্রপতি পদটি দৈনন্দিন নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র না হলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হিসেবে এর রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব যথেষ্ট।




