সংবাদ বিশ্লেষণ
জয়ন্ত আচার্য
যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি এবং বিশ্বশক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল সমীকরণের মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লিতে শেষ হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এই সম্মেলন শেষ পর্যন্ত শুধু একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছানো ব্রিকসের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
নয়াদিল্লি ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করে বিশ্বের সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ ও সংঘাতের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একতরফা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য সচল রাখা এবং নাবিকদের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্রিকস এবার শুধু অর্থনৈতিক জোটের পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট নিয়েও একটি সমন্বিত অবস্থান প্রকাশের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
এবারের ঘোষণাপত্রের আরেকটি বড় দিক হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া ব্রাজিল ও ভারতের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, ব্রিকসের একটি বড় লক্ষ্য হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোকে বর্তমান অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্রিকসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। একতরফা শুল্ক, অশুল্ক বাধা, নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার বিরোধিতা করে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যনীতি ক্রমেই ভূরাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে ব্রিকসের এই অবস্থান মূলত এমন একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর দাবি, যেখানে কোনো একক শক্তি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
তবে ব্রিকসের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-এই জোট কি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠবে, নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে? বাস্তবতা হলো, সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান এক নয়। চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা প্রভাব কমানোর বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হলেও ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। তাই ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। বরং এটিকে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি মঞ্চ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এবারের সম্মেলন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এবং নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী ও সি চিন পিংয়ের বৈঠক ব্রিকসের ভবিষ্যৎ সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। দুই এশীয় শক্তির মধ্যে উত্তেজনা কমলে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা যেমন বাড়বে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াতেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ব্রিকসের প্রভাব তাই বহুমাত্রিক। ভারত ও চীনের সম্পর্কের উন্নতি হলে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো অবকাঠামো, বন্দর, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য ভারত ও চীন উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের প্রতিযোগিতা যদি সংঘাতের পরিবর্তে উন্নয়নকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ঢাকা উভয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির মূল্য, পরিবহন ব্যয়, শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এ অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী দিনে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নিজেদের বৈচিত্র্যকে শক্তিতে পরিণত করা। বর্তমানে ১১ সদস্যের এই জোট বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সদস্যসংখ্যা ও প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মতপার্থক্যও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্যনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার-সব ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থ এক নয়। তাই ঘোষণাপত্র গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য বৃদ্ধি, আর্থিক সংযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়লে ব্রিকসের রাজনৈতিক ঘোষণাগুলো কার্যকর শক্তিতে পরিণত হবে না।
২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাবও সেই কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি ও নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ সফল হলে ব্রিকস বছরে একবার রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনের সংগঠন না থেকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন সহযোগিতার একটি স্থায়ী শক্তিশালী কাঠামোয় পরিণত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ব্রিকসকে কীভাবে দেখবে? ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় দেশগুলো নিশ্চয়ই জোটটির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, বাণিজ্যব্যবস্থায় বহুমুখী কাঠামো এবং পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ে ওঠার উদ্যোগ তাদের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে ভারতসহ অনেক সদস্য একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখায় ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সম্ভবত এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা-দুই পথই অনুসরণ করবে।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মতপার্থক্যের মধ্যেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি করা। ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ দেখিয়েছে, উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে চায়। ব্রিকস ভবিষ্যতে পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটি স্পষ্ট যে বিশ্বব্যবস্থা আর এককেন্দ্রিক থাকছে না। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নতুন শক্তিকেন্দ্রগুলো নিজেদের জন্য বৃহত্তর পরিসর তৈরি করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি বড় সুযোগও। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে তাদের বড় শক্তির প্রতিযোগিতায় পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে সামনে রেখে এগোতে হবে। নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন সেই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত।
: বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার নতুন সমীকরণ
সংবাদ বিশ্লেষণ
জয়ন্ত আচার্য
যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি এবং বিশ্বশক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল সমীকরণের মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লিতে শেষ হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এই সম্মেলন শেষ পর্যন্ত শুধু একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছানো ব্রিকসের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
নয়াদিল্লি ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করে বিশ্বের সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ ও সংঘাতের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একতরফা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য সচল রাখা এবং নাবিকদের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্রিকস এবার শুধু অর্থনৈতিক জোটের পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট নিয়েও একটি সমন্বিত অবস্থান প্রকাশের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
এবারের ঘোষণাপত্রের আরেকটি বড় দিক হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া ব্রাজিল ও ভারতের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, ব্রিকসের একটি বড় লক্ষ্য হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোকে বর্তমান অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্রিকসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। একতরফা শুল্ক, অশুল্ক বাধা, নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার বিরোধিতা করে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যনীতি ক্রমেই ভূরাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে ব্রিকসের এই অবস্থান মূলত এমন একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর দাবি, যেখানে কোনো একক শক্তি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
তবে ব্রিকসের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-এই জোট কি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠবে, নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে? বাস্তবতা হলো, সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান এক নয়। চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা প্রভাব কমানোর বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হলেও ভারত একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। তাই ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। বরং এটিকে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি মঞ্চ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এবারের সম্মেলন নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এবং নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী ও সি চিন পিংয়ের বৈঠক ব্রিকসের ভবিষ্যৎ সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। দুই এশীয় শক্তির মধ্যে উত্তেজনা কমলে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা যেমন বাড়বে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াতেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ব্রিকসের প্রভাব তাই বহুমাত্রিক। ভারত ও চীনের সম্পর্কের উন্নতি হলে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো অবকাঠামো, বন্দর, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য ভারত ও চীন উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের প্রতিযোগিতা যদি সংঘাতের পরিবর্তে উন্নয়নকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ঢাকা উভয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির মূল্য, পরিবহন ব্যয়, শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এ অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী দিনে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নিজেদের বৈচিত্র্যকে শক্তিতে পরিণত করা। বর্তমানে ১১ সদস্যের এই জোট বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সদস্যসংখ্যা ও প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মতপার্থক্যও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্যনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার-সব ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থ এক নয়। তাই ঘোষণাপত্র গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য বৃদ্ধি, আর্থিক সংযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়লে ব্রিকসের রাজনৈতিক ঘোষণাগুলো কার্যকর শক্তিতে পরিণত হবে না।
২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাবও সেই কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি ও নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ সফল হলে ব্রিকস বছরে একবার রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনের সংগঠন না থেকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন সহযোগিতার একটি স্থায়ী শক্তিশালী কাঠামোয় পরিণত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ব্রিকসকে কীভাবে দেখবে? ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় দেশগুলো নিশ্চয়ই জোটটির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, বাণিজ্যব্যবস্থায় বহুমুখী কাঠামো এবং পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ে ওঠার উদ্যোগ তাদের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে ভারতসহ অনেক সদস্য একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখায় ব্রিকসকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সম্ভবত এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা-দুই পথই অনুসরণ করবে।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মতপার্থক্যের মধ্যেও একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি করা। ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ দেখিয়েছে, উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে চায়। ব্রিকস ভবিষ্যতে পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটি স্পষ্ট যে বিশ্বব্যবস্থা আর এককেন্দ্রিক থাকছে না। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নতুন শক্তিকেন্দ্রগুলো নিজেদের জন্য বৃহত্তর পরিসর তৈরি করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি বড় সুযোগও। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে তাদের বড় শক্তির প্রতিযোগিতায় পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে সামনে রেখে এগোতে হবে। নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন সেই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত।




