শতায়ুর পথে হাঁটতে চাইলে: বিশ্বের দীর্ঘায়ু মানুষের জীবনযাপন থেকে কী শেখার আছে

?

তানজিনা হাসান মৌ

ভিনিউজ : দীর্ঘ জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়, সুস্থ, সক্রিয় ও আনন্দময় জীবন কাটানোর মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা। বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলের মানুষ ৯০ থেকে ১০০ বছর বা তারও বেশি সময় সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন। গবেষকরা এসব এলাকাকে ‘ব্লু জোন’ নামে চিহ্নিত করেছেন। এসব অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনদর্শন ও সামাজিক সম্পর্কই দীর্ঘায়ুর অন্যতম রহস্য বলে মনে করা হয়।

বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ব্লু জোনগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানের ওকিনাওয়া, ইতালির সার্ডিনিয়া, গ্রিসের ইকারিয়া, কোস্টারিকার নিকোইয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরও দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্যসচেতন জনগোষ্ঠীর কারণে আলোচনায় এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অঞ্চলের মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রধানত থাকে উদ্ভিদভিত্তিক ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার। তাজা ফল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজ নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস তাদের সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। ওটস, ডালিয়া, কিনোয়া, রাগি কিংবা নানা ধরনের ডালজাতীয় খাবার তাদের দৈনন্দিন খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সবজির মধ্যে বেগুন, বাঁধাকপি, বিট, ব্রকোলি, বেল পেপার ও মিষ্টি আলু বেশি খাওয়া হয়। ফলের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্ব দেন মৌসুমি ও তাজা ফলকে। দিনে অন্তত চার থেকে পাঁচ ধরনের ফল খাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকেই। প্যাকেটজাত বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলাই তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি রান্নার ধরনেও রয়েছে কিছু বিশেষত্ব। ব্লু জোনের বাসিন্দারা সাধারণত কম তেলে রান্না করেন। অলিভ অয়েলের ব্যবহার বেশি হলেও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর তেলও সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি থাইম, রোজমেরি কিংবা বিভিন্ন প্রদাহনাশক মশলা খাবারে যুক্ত করা হয়, যা শরীরের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত।

তবে দীর্ঘায়ুর রহস্য শুধু খাবারে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রিসের ইকারিয়া দ্বীপের মানুষ জীবনকে উপভোগ করেন ধীর গতিতে। তারা অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা বা অতিরিক্ত ব্যস্ততার মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলেন না। পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প-আড্ডা এবং সামাজিক যোগাযোগকে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন। ফলে মানসিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

জাপানের ওকিনাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা হয় ‘হারা হাচি বু’ নামের একটি দর্শন। এর মূল কথা হলো—পেট পুরোপুরি ভরে যাওয়ার আগেই খাওয়া বন্ধ করা। সাধারণভাবে বলা হয়, প্রায় ৮০ শতাংশ পেট ভরলেই খাবার শেষ করতে হবে। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকার এই অভ্যাস স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

ওকিনাওয়ার মানুষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন হলো ‘ইকিগাই’। এটি এমন একটি ধারণা, যা মানুষকে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে উৎসাহিত করে। অবসরের পরও তারা নিজেদের পছন্দের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কেউ বাগান করেন, কেউ বই পড়েন, কেউ শিল্পচর্চা করেন, আবার কেউ পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান। জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ও সক্রিয়তা তাদের মানসিকভাবে সতেজ রাখে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘায়ুর জন্য কোনো জাদুকরি ওষুধ নেই। বরং নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের মূল চাবিকাঠি।

ব্লু জোনের মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শতায়ু হওয়ার লক্ষ্য নয়, বরং প্রতিদিন সুস্থ ও আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকার অভ্যাসই দীর্ঘ জীবনকে সম্ভব করে তোলে।

পূর্বের খবরক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অসাধারণ উত্থান: সংগ্রাম থেকে বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা
পরবর্তি খবরতীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ফ্রান্স, বিদ্যুৎহীন হাজারো পরিবার
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!