লোড শেডিংয়ে নাভিশ্বাস : অতিষ্ঠ জন জীবন, সমাধান কোথায়

 

সুমন আহমেদ

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : তীব্র গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে দেশের মানুষের। শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই বিদ্যুতের এই অনিয়মিত সরবরাহ জনজীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। গভীর রাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা এখন যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে করে শুধু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই নয়, শিক্ষার্থী, কৃষক ও শিল্পখাত-সবখানেই পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা নয়ন বড়ুয়ার মতো অনেকেই অভিযোগ করছেন, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং একবার গেলে দীর্ঘ সময় আর ফিরে আসছে না। একই চিত্র দেশের বিভিন্ন জেলায়ও। নেত্রকোনার কলমাকান্দার বাসিন্দা পলাশ তালুকদার বলেন, এসএসসি পরীক্ষার সময় এমন তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দিনে একাধিকবার লোডশেডিং হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও করুণ। সেখানে শহরের তুলনায় বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যশোর অঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, একদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকট-এই দুইয়ের চাপে সেচ কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় তেলও পাওয়া যাচ্ছে না, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই লোডশেডিংয়ের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। তবে সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি। বরং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমে গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশেপাশে। ফলে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মেটাতে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক হওয়ায় পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। ফলে কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও বাস্তবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ খাতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পরিকল্পনার ঘাটতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জোর দেওয়া হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে এখন অনেকটা “গাড়ি আছে কিন্তু তেল নেই”—এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যা এই সংকটের অন্যতম কারণ।

এদিকে ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপরও কিছুটা নির্ভরশীল বাংলাদেশ। তবে সম্প্রতি একটি বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেখান থেকেও বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরেও কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। এসব কারণ মিলিয়েই হঠাৎ করে লোডশেডিং বেড়ে গেছে।

সরকার বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ চলছে এবং খুব শিগগিরই কিছুটা উন্নতি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কয়েকটি বন্ধ ইউনিট আবার চালু হলে এবং বিদ্যুৎ আমদানি স্বাভাবিক হলে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের দ্রুত সমাধান সহজ নয়। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গেলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বল্পমেয়াদে কিছুটা উন্নতির আশা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর ততদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে এই ভোগান্তি মেনে নিয়েই চলতে হবে।

পূর্বের খবরগুলশান সোসাইটির নতুন কমিটি: সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত , সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মৃধা