ভিনিউজ ডেস্ক : রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। তাঁর মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের ওলেশকি শহরে স্থানীয়ভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সম্মত হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। এর মূল লক্ষ্য শহরটিতে আটকে পড়া বয়স্ক ও অসহায় বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
শুক্রবার মেলানিয়া ট্রাম্পের দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, রাশিয়া ও ইউক্রেনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির শর্ত নির্ধারণে আলোচনা শুরু করেন। এ উদ্যোগে তিনি একক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী ২৭ অক্টোবর মস্কোর স্থানীয় সময় ভোর ৪টা থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে। একই দিন কিয়েভের স্থানীয় সময় ভোর ৩টা থেকে ইউক্রেনও যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দুই দেশের পক্ষ থেকেই শুক্রবার সীমিত পরিসরের এই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওলেশকি শহরে এখনো প্রায় ১ হাজার ৭০০ বেসামরিক মানুষ আটকা পড়ে আছেন। তাঁদের অধিকাংশই বয়স্ক। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের পথ বন্ধ থাকায় তাঁরা চরম মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন। শহরটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত, চারপাশের সড়কে স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত সামরিক হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
মেলানিয়া ট্রাম্প বলেন, শহরটির বাসিন্দাদের জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন। তাঁর হস্তক্ষেপ ছাড়া সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বয়স্কদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তিনি জানান, দুই দেশের বেসামরিক প্রতিনিধিরা বাসিন্দাদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের প্রয়োজন নির্ধারণ করবেন। যারা শহর ছেড়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য সমন্বিত পরিবহন ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে। কেউ রাশিয়ায়, আবার কেউ ইউক্রেনে যেতে চাইতে পারেন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ফোনালাপেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। তবে উদ্ধার অভিযানের নির্দিষ্ট পথ কিংবা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে চাননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, পুরো অভিযান সম্পন্ন করতে অন্তত কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক সংসদীয় কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস বলেছেন, উদ্ধার অভিযান ধাপে ধাপে পরিচালিত হবে। এটি অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। ইউক্রেনের সংসদ সদস্য দাভিদ আরাখামিয়া এ উদ্যোগে পোপ লিও এবং মেলানিয়া ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
এর আগে পোপ লিও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে ওলেশকির মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ভ্যাটিকানের তথ্য অনুযায়ী, পুতিন সেখানে মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়তার উদ্যোগকে সমর্থন করেছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্ত্রীর উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং উভয় পক্ষই সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের পুনর্মিলনেও মেলানিয়া দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
তবে ওলেশকির মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইউক্রেনের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সংগঠনের প্রধান ওলেক্সান্দ্রা মাতভিচুক জানিয়েছেন, অব্যাহত গোলাবর্ষণ, স্থলমাইন ও চালকবিহীন সামরিক ড্রোনের হামলার কারণে বাসিন্দারা শহর ছেড়ে যেতে পারছেন না। খাদ্যসংকট এতটাই ভয়াবহ যে অনেক মানুষ ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, শহরে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক খাদ্য সরবরাহ পৌঁছেছিল গত মে মাসে।
স্বাধীন সাংবাদিক জারিনা জাব্রিস্কির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেনারেটরের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ শেষ হয়ে যাওয়ায় শীতের মধ্যে বাসিন্দাদের অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন।
মেলানিয়া ট্রাম্প জানিয়েছেন, উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করতে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে যুক্ত করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স জানিয়েছে, আগামী ২৯ অক্টোবর রাশিয়া ও ইউক্রেনের পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে ওলেশকিতে প্রবেশের জন্য তারা বিশেষ অনুমতি পেয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানে এই সীমিত যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে দুই পক্ষের বাস্তব সহযোগিতা এবং নিরাপদ মানবিক করিডর প্রতিষ্ঠার ওপর। তবে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ একটি শহরের অসহায় মানুষের জন্য এই উদ্যোগ আপাতত নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
-CNN




