বিশেষ প্রতিবেদন | ভিনিউজ
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে দেশটির নারী ও কিশোরীদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর পরিবর্তন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা-জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোর বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা আফগান নারীরা জানিয়েছেন, তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর তাদের জীবন যেন সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে গেছে।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার পর তালেবান আবারও দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকেই নারীদের অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে। মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর স্কুলে যাওয়া বন্ধ, উচ্চশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা, বহু কর্মক্ষেত্র থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়া এবং পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণে নানা বাধা-সব মিলিয়ে আফগান নারীদের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে।
আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মাত্র ৭ শতাংশ নারী কর্মরত। তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি অবশ্য বিবিসিকে বলেছেন, নারীদের জীবনের সব ক্ষেত্র পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। তার দাবি, দেশটিতে প্রায় ৩০ লাখ মেয়ে স্কুল ও ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে এবং নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। কাবুলের ১৮ বছর বয়সী শাকিবা অনলাইনে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারলেও তার ছোটবেলার স্বপ্ন—পাইলট হওয়া—এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, তালেবান ক্ষমতায় ফেরার দিনটি তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট এলেই মনে হয় পুরোনো ক্ষত আবার খুলে যায়।
একসময় টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপক ছিলেন জুহাল। তালেবানের বিভিন্ন নির্দেশের কারণে চাকরি হারিয়ে এখন দিনের পুরো সময় ঘরেই কাটাতে হয় তাকে। তার ভাষায়, সংবাদ পড়ার সময় তিনি নিজের কাজ ও পরিচয় নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন। এখন সেই জীবন কেবল অতীতের স্মৃতি।
নারীদের ওপর শারীরিক শাস্তির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তালেবান প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের শাস্তি আবার চালু করেছে। সরকারি নথিতে ২০২১ সালের পর থেকে শত শত মানুষকে বেত্রাঘাতের কথা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা শাইমা জানান, তাকে ৫০ বার বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর তার পরিবারও গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছে। আরেক নারী মানিজাকে এক পুরুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের অভিযোগে প্রকাশ্যে ৩৯ বার বেত্রাঘাত এবং পরে কারাবন্দি করা হয়।
স্বাস্থ্যসেবাতেও বিধিনিষেধের প্রভাব ভয়াবহ। আফগানিস্তানে মাতৃমৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। পুরুষ চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় অনেক নারী ও কিশোরী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ধাত্রী মারজিয়া বিবিসিকে জানান, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা ৪৫ বছর বয়সী ছয় সন্তানের এক মাকে তারা বাঁচাতে পারেননি। শিশুটিকে বাঁচানো গেলেও মায়ের মৃত্যু পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দেশটিতে প্রতি ৪ হাজার ৫০ জন নারীর জন্য মাত্র একজন ধাত্রী রয়েছে।
তবু সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আশা ছাড়েননি অনেক আফগান নারী। ২৪ বছর বয়সী নূরি আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিলেন। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও তিনি কাজ শুরু করেন। বর্তমানে একটি জ্যাম তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি নিজের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন এবং সেখানে ১০ জন নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছেন।
১৩ বছর বয়সী আস্মার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। তার বিশ্বাস, একদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। আর কাবুলের ডেন্টাল সহকারী এলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আফগান নারীদের কথা ভুলে না যেতে। তার আবেদন-নারীদের শিক্ষা ও কাজের অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্বকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পর আফগান নারীদের জীবন তাই এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। শিক্ষা ও কর্মজীবনের দরজা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের স্বপ্ন, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও যারা কাজ করছেন, ব্যবসা করছেন কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের সংগ্রামই প্রমাণ করে—আফগান নারীদের আশা এখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি।




