বর্ণাঢ্য আয়োজনে নববর্ষ বরণ, ঐক্যের বার্তা

 

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনে আজ যেন শিকড়ে ফেরার এক অভূতপূর্ব জাগরণ দেখা গিয়েছে গোটা দেশ জুড়ে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য আয়োজন, লোকজ সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রকাশ এবং সামাজিক ঐক্যের বার্তা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য উৎসবমুখর আবহ।

উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই শোভাযাত্রা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় চারুকলা প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। বর্ণিল মুখোশ, বিশাল মোটিফ, স্ক্রল পেইন্টিং এবং ঢাকের তালে তালে এগিয়ে চলা এই শোভাযাত্রা যেন বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।


এবারের প্রতিপাদ্য ছিল-“নববর্ষের সুরে ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ।” শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্রতিটি মোটিফ-মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া প্রতীকী অর্থ বহন করে। উদীয়মান সূর্যের প্রতীক হিসেবে মোরগ আশার বার্তা দেয়, পায়রা শান্তির, হাতি শক্তি ও স্থিতিশীলতার, দোতারা লোকজ ঐতিহ্যের এবং ঘোড়া অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। শোভাযাত্রায় রাষ্ট্রীয় অতিথি , বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কয়েক বছরের বিরতির পর এবার মানুষের অংশগ্রহণের এই বিপুলতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। করোনাভাইরাস মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রমজানের সময়সূচির কারণে গত কয়েক বছর শোভাযাত্রার প্রাণচাঞ্চল্য কিছুটা ম্লান থাকলেও এবার তা পূর্ণমাত্রায় ফিরে এসেছে।

নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল কঠোরভাবে নিশ্চিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি র‍্যাব, সোয়াট এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ছিল, যাতে উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
নববর্ষের সূচনা হয় ভোরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজনের মধ্য দিয়ে। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন বছরকে আহ্বান জানানো হয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আয়োজনে মোট ২২টি গান পরিবেশিত হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগে ভাসিয়ে তোলে।
ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী তার বক্তব্যে বলেন, পয়লা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সমাজে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টির প্রবণতা একটি অশনি সংকেত। তিনি এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করেন, যেখানে সবাই নির্ভয়ে গান গাইতে, মত প্রকাশ করতে এবং সংস্কৃতি চর্চা করতে পারে।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের প্রতিটি জেলায়ও নববর্ষ উদযাপিত হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে শোভাযাত্রা, গান, নাচ, আবৃত্তি ও আলপনা অঙ্কনের মতো নানা অনুষ্ঠান। ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কেও বর্ষবরণ পর্ষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে পৃথক মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজিত হয়। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ঐতিহ্যবাহী ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩-কে স্বাগত জানানো হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ, যা বাঙালির সংগীতপ্রেমের এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে।
চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম।
গুলশান এলাকায় গুলশান সোসাইটি উদ্যোগে রাস্তায় সারারাত ধরে আলপনা আঁকার উদ্যোগ ছিল উৎসবের আরেকটি আকর্ষণ। শিশু থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী এবং প্রবীণরাও অংশ নেন এই রঙিন শিল্পকর্মে, যা শহরের রাস্তাগুলোকে রূপ দেয় এক বিশাল ক্যানভাসে।রোটারী ক্লাব অফ বাংলােদশ দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে পয়লা বৈশাখের বর্নাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আযোজন করে। ঢাকায় গ্রান্ট প্যালেস কনভেনশন হলে দিনব্যাপী বৈশাখী উৎসব উৎযাপিত হয় । সুরের ধারা ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ঐতিহ্যবাহী ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’্ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩-কে স্বাগত জানায় । ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো রবীন্দ্র সরোবর প্রাঙ্গণ, যা বাঙালির সংগীত প্রেমের এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে। চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম।
এবারের নববর্ষ উদযাপনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। কৃষক, শ্রমিক, জেলে, আদিবাসী সম্প্রদায়-সবাই নিজ নিজ সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে অংশ নিয়েছেন এই উৎসবে। ফলে এটি কেবল শহরকেন্দ্রিক কোনো আয়োজন না হয়ে এক সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব পরিস্থিতির অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এবারের নববর্ষ উদযাপনে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তাও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। আয়োজক
অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গণতন্ত্র এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান।সব মিলিয়ে, বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন প্রমাণ করেছে-বাঙালি তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে এখনও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশাখের এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়, এটি আত্মপরিচয়, ঐক্য এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার এক অনন্য উপলক্ষ।

পূর্বের খবরবাংলাদেশিদের জন্য খুলছে ভারতীয় ভিসা
পরবর্তি খবরবিরোধী দলের ওপর ‘স্বৈরাচারের ভূত’ ভর করেছে: তারেক রহমান
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!