ভিনিউজ ডেস্ক: প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বলিউডে শোকের আবহ। সহকর্মী থেকে শুরু করে অনুরাগী অনেকেই তাঁর অভিনয়জীবন ও চলচ্চিত্রে অবদানের কথা স্মরণ করছেন। তবে এই শোকের আবহের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে অতীতে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলা এই অভিনেত্রীর বক্তব্য ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর লেখা ‘Evil Dead’ বা ‘শয়তানের মৃত্যু হল’ মন্তব্যটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর তনুশ্রী লিখেছেন, ‘Evil Dead. Condolences to the family।’ অর্থাৎ, ‘শয়তানের মৃত্যু হল। পরিবারের প্রতি সমবেদনা।’ বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে মৃতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানালেও প্রথম অংশের শব্দচয়ন তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষোভের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও ওই পোস্টে তিনি সরাসরি নানা পাটেকরের নাম উল্লেখ করেননি, অতীতের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাঁর মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনে তনুশ্রী জানিয়েছেন, নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন। তবে সেদিন তার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তার লখনউ যাওয়ার কথা ছিল এবং তিনি সেই কাজেই মনোযোগ দিতে চেয়েছিলেন। তনুশ্রীর কথায়, দিনটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও বিভিন্ন বিষয়বস্তু প্রকাশের পরিকল্পনাও করেছিলেন। কিন্তু নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবরের পর সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইবেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তাকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কী বলবেন।
তনুশ্রীর এই প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে ২০১৮ সালের বলিউডের আলোচিত #MeToo আন্দোলন। ওই সময় নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এসেছিলেন তনুশ্রী। তার অভিযোগ, ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির শুটিং চলাকালীন একটি গানের দৃশ্যকে কেন্দ্র করে নানা পাটেকর তার সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ করেছিলেন।
তনুশ্রীর দাবি ছিল, গানের দৃশ্যে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নাচের কিছু পদক্ষেপ করার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল, যদিও সেগুলি তার চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আপত্তি জানানোর পরও তাকে চাপের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিস্থিতির প্রতিবাদে শুটিং ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বলেও জানিয়েছিলেন অভিনেত্রী। পরবর্তী সময়ে তার আরও অভিযোগ ছিল, ওই ঘটনার পর তার গাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং তাকে হেনস্থার শিকার হতে হয়।

এই অভিযোগ সামনে আসার পর বলিউডে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা, চলচ্চিত্র জগতে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যৌন হেনস্থার অভিযোগের যথাযথ তদন্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তনুশ্রীর বক্তব্য ভারতের বিনোদনজগতে #MeToo আন্দোলনকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছিল।
তবে নানা পাটেকর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তনুশ্রী সিনে অ্যান্ড টিভি আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং পুলিশের কাছেও অভিযোগ জানিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটি পরে বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা যায়। তবে মামলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ অভিযোগের প্রতিটি দিক সম্পর্কে চূড়ান্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়; একইভাবে অভিযোগ ওঠাও কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর তনুশ্রীর মন্তব্য তাই কেবল একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি অতীতের একটি বিতর্কিত অধ্যায়কে আবারও জনপরিসরে ফিরিয়ে এনেছে। একজনের কাছে নানা পাটেকর ছিলেন প্রতিভাবান অভিনেতা, অন্যদিকে তনুশ্রীর অভিযোগের কারণে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে।
মৃত্যুর পর নানা পাটেকরকে ঘিরে শোক ও স্মৃতিচারণের মধ্যেও তনুশ্রীর এই মন্তব্য মনে করিয়ে দিচ্ছে, কোনও আলোচিত ব্যক্তির জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে ওঠা সব প্রশ্নের অবসান ঘটে না। বিশেষত, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যে বিতর্ক একসময় সমাজকে আলোড়িত করেছিল, তার স্মৃতি অনেকের কাছে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।




