নতুন আমদানি নীতি-২০২৬ জারি

ঋণপত্র বা এলসির পাশাপাশি এখন থেকে মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকরা। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্পে বিনিয়োগের জন্য আমদানি সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণ করে এ সংক্রান্ত নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ জারি করেছে সরকার।

এর আওতায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ মিলবে। এ ছাড়া প্রবাসীদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়াও সহজ হবে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নতুন আমদানি নীতির গেজেট প্রকাশ করেছে।

২০২১-২০২৪ আমদানি নীতির মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। নতুন আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত আগের নীতিই কার্যকর ছিল।

নীতিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪-এ এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ থাকলেও বিভিন্ন পণ্য ও খাতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত ছিল। নতুন আদেশে সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগের নীতিতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা এলসি ছাড়া নির্দিষ্ট মূল্যসীমার মধ্যে পণ্য আমদানি করতে পারতেন। নতুন নীতিতে সেই মূল্যসীমা তুলে দিয়ে সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯-এ আমদানি ব্যবস্থাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পের কাঁচামালের সহজলভ্যতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এলসি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ

নতুন নীতির অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো আমদানির অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি আরও নমনীয় করা। এলসির পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যবহার করা আমদানিকারকদের জন্য সহজ হবে।

২০২১-২০২৪ নীতিতেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এলসি ছাড়া আমদানির সুযোগ ছিল। তবে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পরিশোধ করে এলসি ছাড়া আমদানির বার্ষিক সীমা ছিল ৫ লাখ মার্কিন ডলার। বিশেষ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদা সীমাও ছিল।

নতুন নীতিতে এসব সীমাবদ্ধতার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা কমিয়ে আমদানিকারক ও বিদেশি সরবরাহকারীর মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তির সুযোগ বাড়বে।

মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড গুদাম

নতুন আমদানি নীতিতে ফ্রি ট্রেড জোন ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পুনঃরপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।

আগের আমদানি নীতির তুলনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন। ২০২১-২০২৪ নীতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকলেও নতুন আদেশে বাণিজ্য ও লজিস্টিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউসের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

প্রবাসীদের শিল্পে আমদানি সুবিধা

নতুন নীতিতে প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’র সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আধুনিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে শিল্প ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা

নতুন নীতিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনা মূল্যে বা ‘ফ্রি অব কস্ট’ ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দ্রুত সংগ্রহের সুযোগ বাড়লে রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।

৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ

নতুন আমদানি নীতির আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মোটরসাইকেল আমদানিতে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বাড়ানো। ২০২১-২০২৪ নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

ফলে নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মাঝারি ও উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি বাংলাদেশে আমদানির সুযোগ বাড়বে। তবে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রতিযোগিতামূলক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আমদানি প্রক্রিয়ায় এইচএস কোডের গুরুত্ব

নতুন নীতিতে পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্য নিয়ে আমদানিকারকদের দীর্ঘদিনের জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতির খসড়া পর্যায়ে এইচএস কোডের বর্ণনাকে চূড়ান্ত ভিত্তি করার প্রস্তাব করা হয়েছিল, যাতে কোড ও পণ্যের বর্ণনার অসামঞ্জস্যের কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় হয়রানি ও বিলম্ব কমে।

আমদানি নীতির পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১-২০২৪ আদেশের মূল লক্ষ্য ছিল আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করা। নতুন ২০২৬-২০২৯ আদেশে সেই ধারা আরও বিস্তৃত করে আমদানি অর্থায়ন, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস, পুনঃরপ্তানি ও প্রবাসী বিনিয়োগকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশেষ করে এলসির পাশাপাশি মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় পরিবর্তন। এতে আমদানিতে সময় ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা কমতে পারে। তবে এলসির বাইরে লেনদেন বাড়ার সঙ্গে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ওভার বা আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং অর্থ পাচার ঠেকাতে নজরদারির প্রয়োজনও বাড়বে।

নতুন নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি ব্যবস্থাকে এলসিনির্ভর প্রচলিত কাঠামো থেকে আরও নমনীয়, চুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

নতুন নীতির শুরুতেই এফটিএ, সেপা, ইপিএ, ইউনিলেটারাল অ্যাগ্রিমেন্ট ও বাইলেটারাল অ্যাগ্রিমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। সে বিবেচনায় এসব চুক্তির আওতায় আমদানি ব্যবস্থাকে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন নীতিতে।

বিশেষ করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) বা সেপা কার্যকর করলে নতুন আমদানি নীতির কাঠামোর সঙ্গে সেগুলো সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।

পূর্বের খবররাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ
পরবর্তি খবরসম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারবেন গ্রাহকেরা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!