বিহারের ভোটের ফল সারা ভারতকে চমকে দিল। যত পরিষ্কার হচ্ছে, সমস্ত আনুষঙ্গিক তথ্য, তত চমকপ্রদ সব তথ্য আসছে। ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে, বিহারের মহিলারাই এনডিএ-এর (NDA) এই জয়কে চালিত করেছেন। ১০,০০০ টাকার ‘লাভার্থী’ (Labharthi) সুবিধা তো ছিলই। কিন্তু সেটা ছাড়াও আরও ৫ কারণ রয়েছে বিহারের এই এনডিএ-জয়ে।
নারীর ভূমিকা
বিহার নির্বাচনে এনডিএ-এর জয়ের পিছনে নারীসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনার অধীনে ১০০০০ টাকা সুবিধা প্রদানের কথা ঘোষণা করেছিলেন। তবে তাঁর সেই উদ্যোগের বাইরেও, আরও কয়েকটি মূল কারণ কাজ করেছে এনডিএ-এর এই জয়ের পিছনে। কী কী?
রেকর্ড সংখ্যক নারীভোটার
এই বছর বিহারে সামগ্রিক ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৬৭.১৩ শতাংশ, যা রেকর্ড। তবে মহিলা ভোটারের উপস্থিতি ছিল আরও বেশি– ৭১.৭৮ শতাংশ, যা পুরুষদের (৬২.৯৮ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। অনেক জেলাতেই পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা ১০-২০ শতাংশ বেশি ছিল। সুপৌলে এই ব্যবধান ছিল সবচেয়ে বেশি– ২০.৭১ শতাংশ। এছাড়া কিষাণগঞ্জ, মধুবনী, গোপালগঞ্জ, আরারিয়া, দরভাঙ্গা এবং মাধেপুরায়ও একই ধরনের পার্থক্য দেখা গিয়েছে। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে নারীরা বৃহত্তর সংখ্যায় ভোট দিলেও ২০২৫ সালের এই রেকর্ড উপস্থিতি সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।
১০,০০০ টাকার প্রকল্প-প্রভাব
মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা, যেখানে যোগ্য মহিলাদের জন্য ১০,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এই জয়ে এক শক্তিশালী সমর্থন জুগিয়েছে। ২০২২ সালের জাতি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বিহারের ৩৪ শতাংশেরও বেশি পরিবার মাসে ৬,০০০ টাকা বা তার কম আয়ে জীবনধারণ করে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যেমন তফসিলি জাতি এবং ইবিসি (EBC) পরিবারগুলির জন্য এককালীন ১০,০০০ টাকার অঙ্কটি এক মাসের আয়ের চেয়েও বেশি!
ফলে, এটিকে গতানুগতিক এক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে না দেখে, অনেক মহিলা ভোটারই এটিকে বড় সাহায্য হিসেবে দেখেছেন, যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের হতকুচ্ছিত পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টে দিতে পারে, তাঁদের কিছুটা স্বাবলম্বী করেও তুলতে পারে।
মদ নিষিদ্ধকরণের সুফল
বছরখানেক আগে শুরু হওয়া মদ নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্ত এখনও নির্বাচনী আচরণকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। অনেক মহিলা বিশ্বাস করেন, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে গার্হস্থ্য হিংসা কমেছে, বাড়িতে টাকা জমেছে এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারের কাছে এই নিষিদ্ধকরণই ক্ষমতাসীন জোটকে সমর্থনের অন্যতম কি পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এসআইআর
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী এই বছর আশ্চর্যজনকভাবে খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকেই অনুমান করা হচ্ছে। এই সংশোধনের পরে ভোটার তালিকায় লিঙ্গ অনুপাত (প্রতি ১,০০০ পুরুষে মহিলা) ৯০০-এর নীচে নেমে ৮৯২-তে দাঁড়িয়েছে (লোকসভা ২০২৪-এর ৯১৭ থেকে)। এই কারণে বিরোধী দল দাবি করে, ৫.৭ লক্ষেরও বেশি মহিলার নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে এবং এটিকে একরকম ‘ভোট চুরি’ বলেই দাগানো হয়। তবে, এই বিতর্ক ভোটারদের নিরুৎসাহিত করার বদলে, উল্টো তাঁদের বেশি করে সক্রিয় করে তুলেছে। অনেক মহিলা ভোটার নিজেদের নাম যাচাই করেছেন, অন্যদের সাহায্য করেছেন এবং ভোট দেওয়া নিশ্চিত করেছেন।
১.৮০ লক্ষ জীবিকা দিদি
নির্বাচন কমিশন একটি বিশাল নারী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। হাজার হাজার ‘জীবিকা দিদি’কে কাজে লাগিয়েছে। এঁদের কাজ ছিল মানুষজনকে তথ্য, বুথ এবং ফর্মের বিষয়ে গাইড করা। তাঁদের এই প্রচেষ্টার প্রভাব ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে মহিলা এবং প্রথমবার যাঁরা ভোট দিচ্ছেন (১৮-১৯ বছর বয়সী ১৪ লক্ষেরও বেশি নতুন ভোটার), তাঁদের মধ্যে। এই দিদিরা ভোটারদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, শুধু আর্থিক সুবিধার বাইরেও, নারীর সুরক্ষা, সামাজিক সংস্কার এবং তাঁদের তৃণমূলস্তরের সক্রিয়তা বিহারে এনডিএ-এর জয়ের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।




