ভিনিউজ : আমরা চোখের সামনে যা দেখি, মস্তিষ্ক কি ঠিক সেটাই দেখছে? নাকি সচেতনভাবে একটি দৃশ্য দেখার পাশাপাশি মস্তিষ্কের ভেতরে অন্য দৃশ্যের তথ্যও সমান তালে কাজ করতে থাকে? মানুষের চেতনা ও দৃষ্টিশক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নতুন এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ সচেতনভাবে দেখা ছবি এবং সচেতনতার আড়ালে থাকা ছবির মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫ বার পালাক্রমে পরিবর্তিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জেনিস কে হেসে, ডরিস ওয়াই সাও এবং তাদের সহযোগীরা এই গবেষণা পরিচালনা করেন। ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক গবেষণা-প্রাকপ্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম বায়োআর্কাইভে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটির শিরোনাম ‘র্যাপিড অলটারনেশন অব কনশাস অ্যান্ড সাপ্রেসড স্টিমুলাস রিপ্রেজেন্টেশনস ইন দ্য প্রাইমেট ব্রেন’। তবে গবেষণাটি এখনো বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন বা পিয়ার রিভিউয়ের মধ্য দিয়ে যায়নি।
গবেষণায় প্রথমে ১৪ জন মানুষের ওপর দৃষ্টিসংক্রান্ত একটি পরীক্ষা চালানো হয়। দুই চোখের সামনে দুটি আলাদা ছবি দেখানো হয়েছিল। বিশেষ পদ্ধতিতে একটি ছবি সচেতনভাবে দৃশ্যমান রাখা হয়, অন্যটি চোখের সামনে উপস্থিত থাকলেও সচেতন উপলব্ধির বাইরে চলে যায়। এই পদ্ধতির নাম ‘বাইনোকুলার ফ্ল্যাশ সাপ্রেশন’। অর্থাৎ চোখে দুটি ছবির তথ্য পৌঁছালেও মানুষ সাধারণত একটিকেই সচেতনভাবে দেখতে পান।
এরপর দুটি ম্যাকাক বানরের মস্তিষ্কে বিশেষ ইলেকট্রোড বা নিউরোপিক্সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ রেকর্ড করেন গবেষকেরা। মস্তিষ্কের ইনফেরোটেম্পোরাল কর্টেক্স ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের বিভিন্ন অংশে এই পরীক্ষা চালানো হয়।
ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। বাইরে থেকে বানরদের দেখলে মনে হচ্ছিল, তারা একটি নির্দিষ্ট মুখের ছবিই দেখছে। কিন্তু মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সংকেত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কখনো সচেতনভাবে দেখা মুখটির তথ্য, আবার কখনো সচেতনতার আড়ালে থাকা মুখটির তথ্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। এই পরিবর্তন ঘটছে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫ বার। সচেতনভাবে দেখা ছবির সময় সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যের স্নায়বিক সংকেত তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী ছিল।
গবেষকদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে মানুষ প্রতি সেকেন্ডে ১৫ বার চোখের সামনে দৃশ্য পরিবর্তন হতে দেখছে। বরং বাইরে থেকে দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা স্থির থাকলেও মস্তিষ্কের স্নায়বিক কার্যকলাপে সচেতন ও অবদমিত তথ্যের মধ্যে দ্রুত পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটছে।
এর আগে ২০২০ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইলাইফ’-এ প্রকাশিত হেসে ও সাওয়ের আরেক গবেষণাতেও দেখা গিয়েছিল, সচেতনভাবে দেখা ছবির পাশাপাশি সচেতনতার বাইরে থাকা ছবির তথ্যও মস্তিষ্কের মুখ শনাক্তকারী স্নায়ুকোষে উপস্থিত থাকতে পারে। নতুন গবেষণাটি সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। এবার শুধু তথ্যের উপস্থিতি নয়, সেই তথ্য কীভাবে সময়ের সঙ্গে পালাক্রমে সক্রিয় হচ্ছে, তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আবিষ্কার মানুষের সচেতনতা, মনোযোগ, স্মৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। কেন আমরা কিছু বিষয় সহজেই খেয়াল করি, অথচ চোখের সামনে থাকা অন্য কিছু উপেক্ষা করি, তার ব্যাখ্যা খুঁজতেও গবেষণাটি সহায়ক হতে পারে।
তবে মানুষের মস্তিষ্কেও একইভাবে প্রতি সেকেন্ডে ১৫ বার এই পরিবর্তন ঘটে কি না, তা সরাসরি প্রমাণিত হয়নি। গবেষণাটি মূলত বানরের মস্তিষ্কে স্নায়বিক সংকেত বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আরও পরীক্ষা ও স্বাধীন গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবু মানুষের চেতনা কীভাবে তৈরি হয়, সেই জটিল রহস্য উন্মোচনে নতুন গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




