চাঁদের ‘কলঙ্ক’ নিয়ে বদলে যেতে পারে ইতিহাস! চিনের আনা শিলার নমুনায় মিলল ৪৩৩ কোটি বছরের প্রাচীন সংঘর্ষের প্রমাণ

vnewsbd.com -চাঁদের দূরবর্তী গোলার্ধ থেকে চ্যাং-৬ মিশনের আনা শিলা বিশ্লেষণে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণা বলছে, চাঁদের গর্ত ও অববাহিকা হয়তো একবারের মহাজাগতিক বিপর্যয়ে নয়, বরং শত কোটি বছর ধরে চলা অসংখ্য সংঘর্ষের ফল।
পৃথিবী থেকে দেখা চাঁদের কালচে দাগ বা ‘কলঙ্ক’ নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরোনো। এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, প্রায় ৩৯০ কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি বিশাল মহাজাগতিক সংঘর্ষপর্বেই চাঁদের অধিকাংশ গর্ত ও অববাহিকার সৃষ্টি। কিন্তু চীনের চ্যাং-৬ মহাকাশযানের আনা নতুন শিলার নমুনা সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। গবেষকদের মতে, চাঁদের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস হয়তো আরও দীর্ঘ এবং জটিল।

পৃথিবী থেকে তাকালে চাঁদের গায়ে যে কালো ছোপ বা ‘কলঙ্ক’ দেখা যায়, বাস্তবে সেগুলো বিশাল গর্ত, খাদ ও অববাহিকা। কোটি কোটি বছর আগে গ্রহাণু ও মহাজাগতিক পাথরের আঘাতে এসব গঠন তৈরি হয়েছে। তবে এগুলো ঠিক কখন এবং কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।

এই গবেষণায় নতুন মোড় এনে দিয়েছে চীনের চ্যাং-৬ মহাকাশ মিশন। ২০২৪ সালে এই মহাকাশযান প্রথমবারের মতো চাঁদের পৃথিবী থেকে অদৃশ্য দূরবর্তী গোলার্ধে অবতরণ করে সেখানকার মাটি ও শিলার নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। চাঁদের এই অংশটি এতদিন সরাসরি গবেষণার সুযোগের বাইরে ছিল।

চাঁদের একটি দিক সবসময় পৃথিবীর দিকে থাকলেও অন্য দিকটি কখনোই দেখা যায় না। কারণ, চাঁদ নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে এবং পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সমান সময় নেয়। ফলে দূরের গোলার্ধ দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল রহস্যময়।

চ্যাং-৬-এর আনা নমুনা বিশ্লেষণ করে চীনের গুয়াংঝৌ ইনস্টিটিউট অব জিওকেমিস্ট্রির অধ্যাপক ওয়ানফেং ঝ্যাংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ।

গবেষকরা চাঁদ থেকে আনা ২৮টি শিলাখণ্ড পরীক্ষা করে দেখেছেন, অতীতে ভয়াবহ মহাজাগতিক সংঘর্ষের কারণে এসব শিলা গলে গিয়েছিল এবং পরে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়েছে। আধুনিক বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, এসব শিলার বয়স প্রায় ১১৩ কোটি থেকে ৪৩৩ কোটি বছরের মধ্যে। এর মধ্যে দুটি শিলার বয়স প্রায় ৪৩৩ কোটি বছর, যা চাঁদের দূরবর্তী গোলার্ধে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সংঘর্ষজনিত গলিত শিলার অন্যতম প্রমাণ।

এই তথ্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতদিন মনে করা হতো, প্রায় ৩৯০ কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া ‘লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট’ নামে পরিচিত একটি স্বল্পস্থায়ী সংঘর্ষপর্বে চাঁদের অধিকাংশ গর্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, চাঁদের ইতিহাসে কোনো একক বিপর্যয়ই প্রধান ছিল না।

গবেষকদের মতে, বরং শত কোটি বছর ধরে ছোট-বড় অসংখ্য গ্রহাণু ও মহাজাগতিক বস্তুর ধারাবাহিক আঘাতে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে চাঁদের বর্তমান ভূপ্রকৃতি। অধ্যাপক ওয়ানফেং ঝ্যাং বলেন, চাঁদের দূরবর্তী গোলার্ধের সংঘর্ষের ইতিহাস কোনো একটি বড় ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী বহু সংঘর্ষ সেখানে ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু চাঁদের ইতিহাস নয়, সৌরজগতের প্রাথমিক বিবর্তন সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিতে পারে। পৃথিবীতে প্রাচীন সংঘর্ষের অনেক চিহ্ন সময়ের সঙ্গে মুছে গেলেও, চাঁদের পৃষ্ঠে সেই ইতিহাস এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। তাই চাঁদের শিলার বয়স ও গঠন বিশ্লেষণ করে সৌরজগতের প্রথম দিককার পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে চাঁদের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করা গেলে এই নতুন তত্ত্ব আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। একই সঙ্গে চাঁদের গর্ত, অববাহিকা এবং তার ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোও নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

চীনের চ্যাং-৬ মিশনের এই সাফল্য তাই শুধু মহাকাশ প্রযুক্তির অর্জন নয়, বরং চাঁদের অতীত ইতিহাস উন্মোচনের ক্ষেত্রেও এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নতুন গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে আরও প্রমাণিত হলে, চাঁদের ‘কলঙ্ক’ নিয়ে আমাদের বৈজ্ঞানিক ধারণা এবং চন্দ্র-ইতিহাসের বহু অধ্যায় নতুনভাবে লিখতে হতে পারে।

পূর্বের খবরবার্লিন প্রাইড শোভাযাত্রায় সন্ত্রাসী হামলা: নিহত ১, আহত অন্তত ২৯; জোরদার অভিযান, শোক ও নিরাপত্তা সতর্কতা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!